ইসলামী জীবনবিধানে প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য রয়েছে বিশেষ দিকনির্দেশনা ও দোয়া। যেকোনো ধরনের বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট কিংবা কারো মৃত্যুসংবাদ শুনলে মুসলিম হিসেবে আমাদের একটি বিশেষ বাক্য পাঠ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাক্যটি হলো—‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। এটি কেবল একটি সান্ত্বনা বাক্য নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতি একনিষ্ঠ স্বীকৃতি এবং চরম বিপদেও অবিচল বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।
সাধারণত আমাদের সমাজে ধারণা করা হয় যে, এই দোয়াটি কেবল কারো মৃত্যুর সংবাদ শুনলেই পড়তে হয়। অথচ ইসলামী শরিয়ত ও পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ছোট-বড় যেকোনো মুসিবত, ক্ষতি বা কষ্টের সম্মুখীন হলেই এই দোয়া পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন: আরবি ও অর্থ
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত এই বাক্যটি অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য বহন করে। নিচে এর মূল আরবি, উচ্চারণ এবং বাংলা অর্থ প্রদান করা হলো:
উচ্চারণ: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
বাংলা অর্থ: নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই দোয়ার তাফসির
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৬-এ আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে এই দোয়ার উল্লেখ করেছেন। এর পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন যে, তিনি মুমিনদের ভয়, ক্ষুধা, জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করবেন। আর যারা এই পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করবে, তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ।
তাফসিরে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ইন্না লিল্লাহি’ (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য) বলার মাধ্যমে বান্দা স্বীকার করে যে, আমাদের জীবন, সম্পদ, পরিবার এবং যা কিছু আমাদের আছে—সবকিছুর প্রকৃত মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনি যেভাবে ইচ্ছা আমাদের পরীক্ষা করার পূর্ণ অধিকার রাখেন। আর ‘ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ (এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব) বলার মাধ্যমে পরকালের চিরন্তন সত্যকে স্মরণ করা হয়। এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর কোনো ক্ষতিই চিরস্থায়ী নয়, কারণ চূড়ান্তভাবে আমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে এবং হিসাব দিতে হবে।
কখন এই দোয়া পাঠ করতে হয়?
রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, এই দোয়াটি যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়ার মতো একটি আমল। নিচে কয়েকটি ক্ষেত্র উল্লেখ করা হলো:
- কারো মৃত্যুসংবাদ শ্রবণ করলে।
- যেকোনো ধরনের ছোট বা বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলে।
- শারীরিক অসুস্থতা, আঘাত বা তীব্র মানসিক কষ্টের সময়।
- দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ বিপত্তি, যেমন কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস হারিয়ে গেলে বা বাতি নিভে যাওয়ার মতো ছোটখাটো সমস্যাতেও এটি পাঠ করা সুন্নত।
হাদিসের আলোকে এই দোয়ার ফজিলত
বিপদের সময় এই বাক্য পাঠ করার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর পক্ষ থেকে অফুরন্ত রহমত ও মাগফিরাত লাভ করে। উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, কোনো মুসলিমের ওপর কোনো মুসিবত এলে সে যদি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী এই দোয়া পাঠ করে এবং এর সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো অতিরিক্ত অংশটুকু যুক্ত করে, তবে আল্লাহ তাকে তার মুসিবতের উত্তম প্রতিদান দেন এবং তার চেয়েও উত্তম জিনিস দান করেন। দোয়াটি হলো:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আজিরনি ফি মুসিবাতি ওয়া আখলিফ লি খাইরাম মিনহা।
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে আমার এই বিপদে সওয়াব দান করুন এবং এর বিনিময়ে আমাকে এর চেয়ে উত্তম জিনিস দান করুন।
উম্মে সালামা (রা.) বলেন, যখন আমার স্বামী আবু সালামা (রা.) ইন্তেকাল করলেন, তখন আমি ভাবলাম, আবু সালামার চেয়ে উত্তম আর কে হতে পারে? তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে প্রথম হিজরতকারী পরিবার। তা সত্ত্বেও আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এই দোয়াটি পাঠ করি। ফলশ্রুতিতে, আল্লাহ তাআলা আমাকে আবু সালামার পরিবর্তে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯১৮)।
দোয়া কবুল ও ধৈর্যের শর্তাবলী
মহান আল্লাহ বিপদে আপদে বান্দার দোয়া কবুল করেন এবং উত্তম প্রতিদান দেন, তবে এর জন্য কিছু মৌলিক শর্ত রয়েছে। প্রথমত, বিপদ আসার সাথে সাথেই ধৈর্য (সবর) ধারণ করতে হবে এবং এই দোয়া পড়তে হবে। দ্বিতীয়ত, এই বিপদ বা কষ্টের কারণে আল্লাহর প্রতি কোনো প্রকার অভিযোগ বা আক্ষেপ প্রকাশ করা যাবে না। তৃতীয়ত, বান্দার উপার্জন এবং খাদ্য অবশ্যই হালাল হতে হবে, কারণ হারাম উপার্জন দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।
পড়ার ক্ষেত্রে সাধারণ ভুলসমূহ
আমাদের সমাজে এই দোয়াটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ ভুল লক্ষ্য করা যায়, যা বর্জন করা উচিত:
- কেবল মৃত্যুসংবাদের সাথে সুনির্দিষ্ট করা: অনেকে মনে করেন এটি শুধু কারো মৃত্যুর খবর শুনলেই পড়তে হয়। এটি একটি ভুল ধারণা; যেকোনো ছোটখাটো সংকটেও এটি পড়া সুন্নত।
- মনোযোগহীনভাবে শুধু মুখে উচ্চারণ: অন্তরে আল্লাহর প্রতি সমর্পণ ও বিশ্বাস না রেখে কেবল ঠোঁটের আগায় দোয়াটি উচ্চারণ করলে এর প্রকৃত আধ্যাত্মিক সুফল বা মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায় না।
- দেরিতে পড়া: কোনো বিপদের খবর শোনার দীর্ঘ সময় পর বা আক্ষেপ প্রকাশের পর দোয়াটি পড়া শরিয়তসম্মত ধৈর্যের পরিপন্থী। প্রথম আঘাতেই এটি পাঠ করা উচিত।
উপসংহার
‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ কেবল একটি বাক্য নয়, এটি মুমিনের জীবনের চরম সংকটের সময় এক মহা আশ্রয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবীর কোনো দুঃখ বা কষ্টই স্থায়ী নয়। জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় পরীক্ষায় আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থেকে এই দোয়া পাঠ করা এবং তাঁর কাছেই উত্তম প্রতিদান আশা করাই একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
তথ্যসূত্র
কুরআনের আয়াত
- সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৬ — মুসিবতের সময় ধৈর্যশীলদের গুণাবলী ও এই দোয়া পাঠের নির্দেশ।
হাদিস
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯১৮ (অধ্যায়: জানাজা) — মুসিবতের সময় ইন্না লিল্লাহি পাঠের ফজিলত এবং উম্মে সালামা (রা.)-এর ঘটনার বিবরণ।
- জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৫১১ — বিপদের সময় আল্লাহর কাছে প্রতিদানের দোয়া।

