দৈনন্দিন জীবনে আমাদের প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ছোট-বড় যানবাহনে আরোহণ করতে হয়। ইসলামে প্রতিটি কাজের মতো যানবাহনে চড়ার ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট সুন্নত ও দোয়ার বিধান রয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আজ-জুখরুফ, আয়াত ১৩-১৪ এ এই দোয়ার মূল বিষয়বস্তু ও নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো বাহনে আরোহণ করতেন, আল্লাহর নাম নিয়ে এই দোয়া পাঠ করতেন। বাহনে চড়ার সময় দোয়া পাঠ করলে আল্লাহর বিশেষ হিজাজত বা নিরাপত্তা লাভ করা যায় এবং সফর বরকতময় হয়। নিচে যানবাহনের দোয়া, এর অর্থ, সঠিক নিয়ম ও ফজিলত বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
যানবাহনে আরোহণের সহীহ দোয়া
যানবাহনে স্থির হয়ে বসার পর মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে এই দোয়াটি পাঠ করতে হয়। নিচে দোয়াটির মূল আরবি, বাংলা উচ্চারণ এবং অর্থ প্রদান করা হলো:
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাজা ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনিন, ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লামুনকালিবুন।
অনুবাদ: পবিত্র তিনি যিনি একে আমাদের অনুগত করে দিয়েছেন, অন্যথায় আমরা একে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আর আমরা অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তন করব।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে দোয়ার ভিত্তি
এই দোয়ার মূল ভিত্তি সরাসরি পবিত্র কুরআন থেকে প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, "যাতে তোমরা ওদের পিঠের ওপর বসো, তারপর তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্মরণ করো যখন তোমরা ওর ওপর বসবে এবং বলো, 'পবিত্র তিনি যিনি একে আমাদের অনুগত করে দিয়েছেন...'" (সূরা আজ-জুখরুফ, ৪৩:১৩-১৪)।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আরোহণের চমৎকার একটি আমল বর্ণিত হয়েছে। হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সওয়ারিতে পা রাখতেন তখন বলতেন 'বিসমিল্লাহ'। তারপর যখন পিঠে সোজা হয়ে বসতেন তখন বলতেন 'আলহামদুলিল্লাহ'। এরপর তিনি ওপরের দোয়াটি পাঠ করতেন। দোয়া শেষে তিনি তিনবার 'আলহামদুলিল্লাহ' এবং তিনবার 'আল্লাহু আকবার' বলতেন। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৬০২)।
যানবাহনে চড়ার সুন্নতি আদব
সফর বা যেকোনো ছোট-বড় যাতায়াত নিরাপদ ও ইবাদতে পরিণত করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আদব বা নিয়ম মেনে চলা উচিত:
- বাহনে ওঠার শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' বলা।
- বাহনে আরোহণ করে স্থির হওয়ার পর 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে আরোহণের নির্দিষ্ট দোয়াটি পাঠ করা।
- দোয়া পাঠের পর তিনবার 'আলহামদুলিল্লাহ' এবং তিনবার 'আল্লাহু আকবার' বলা সুন্নত।
- সফরকালে নিজের ও অন্য যাত্রীদের নিরাপত্তার প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলা। কারণ ইসলামে নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ।
দোয়ার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
এই দোয়াটি কেবল পথচলতি কোনো মন্ত্র নয়, বরং এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর ঈমানী চেতনা। প্রথমত, এটি মানুষকে অহংকারমুক্ত করে। মানুষ যখন বিলাসবহুল গাড়ি বা বিমানে চড়ে, তখন তার মনে অহংকার আসতে পারে। কিন্তু যখন সে বলে, "আমরা একে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না," তখন সে স্বীকার করে যে এই প্রযুক্তি বা ক্ষমতা আল্লাহরই দান। দ্বিতীয়ত, "আমরা আমাদের প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তন করব"—এই বাক্যটি ক্ষণস্থায়ী সফরের মাধ্যমে মানুষের জীবনের আসল সফর অর্থাৎ আখেরাতের অন্তিম যাত্রার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা মনকে আল্লাহর প্রতি ধাবিত করে।
ভ্রমণে নিরাপত্তা ও সতর্কতা বিষয়ক ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
অনেকে মনে করেন শুধু দোয়া পড়ে নিলেই সব দায়িত্ব শেষ এবং যেকোনো অসতর্ক ড্রাইভিং বা নিয়ম লঙ্ঘন করা যাবে। ইসলাম এই ধারণাকে সমর্থন করে না। ইসলামে দোয়া করার পাশাপাশি বাহ্যিক সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করার সঠিক নিয়ম হলো—প্রথমে নিজের বাহন ঠিক রাখা ও সতর্ক থাকা, অতঃপর আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাওয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) উট বেঁধে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন নিয়ে বা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অনুচিত।
তথ্যসূত্র
কুরআনিক আয়াত
- সূরা আজ-জুখরুফ, ৪৩:১৩-১৪ — যানবাহনে আরোহণের সময় আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ ও নির্দিষ্ট তাসবীহ পাঠের ঐশী নির্দেশনা।
হাদিস
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৬০২ (অধ্যায়: জিহাদ) — বাহনে আরোহণের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আমল, তাকবীর ও দোয়ার বিস্তারিত বিবরণ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৩৪২ (অধ্যায়: হজ্জ) — সফর ও আরোহণের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পঠিত দোয়ার বর্ণনা।
- সুনান তিরমিযী, হাদিস ৩৪৪৬ (অধ্যায়: দোয়া) — সওয়ারিতে আরোহণের সময় নবীজী (সা.)-এর হাসির রহস্য এবং দোয়ার বিবরণ।

