রমজান মাস কিংবা নফল রোজার ইফতারের সময় মহান আল্লাহর দরবারে মোনাজাত ও দোয়া কবুলের এক অন্যতম বরকতময় মুহূর্ত। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ইফতারের সময় ‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু’ দোয়াটি অত্যন্ত সুপরিচিত এবং বহুল প্রচলিত। তবে একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে যেকোনো আমল করার পূর্বে তার বিশুদ্ধতা ও সুন্নতি পদ্ধতি যাচাই করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই নিবন্ধে আমরা দোয়াটির আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ এবং হাদিস শাস্ত্রের মানদণ্ডে এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করব।
আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু দোয়ার আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
আমাদের সমাজে প্রচলিত ইফতারের এই দোয়াটির মূল পাঠ নিচে তুলে ধরা হলো:
আরবি টেক্সট
বাংলা উচ্চারণ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া ‘আলা রিজকিকা আফতারতু।
বাংলা অনুবাদ
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি তোমারই জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেওয়া রিজিকের মাধ্যমে ইফতার করছি।
হাদিসের মানদণ্ডে দোয়াটির সহিহতা ও বিশুদ্ধতা (Authenticity Check)
হাদিস শাস্ত্র ও মুহাদ্দিসগণের চুলচেরা বিশ্লেষণে ‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু’ দোয়াটির সনদ বা সূত্র দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দোয়াটি ইমাম আবু দাউদ তাঁর বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ ‘সুনান’ এ সংকলন করেছেন। তবে এই হাদিসটির বর্ণনাকারী সুলাইমান ইবনে মুয়াজ সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণের আপত্তি রয়েছে এবং এর সনদটি ‘মুরসাল’ (যে হাদিসে সাহাবির নাম বাদ পড়েছে)।
আধুনিক যুগের প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা নাসিরুদ্দিন আল-অ্যালবানি (রহ.) সহ পূর্ববর্তী বহু মুহাক্কিক আলেম এই হাদিসটিকে যইফ বা দুর্বল বলে স্পষ্ট করেছেন। ইসলামে দুর্বল হাদিসের ওপর ভিত্তি করে কোনো আমলকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা বা আবশ্যকীয় মনে করার সুযোগ নেই। তবে কেউ যদি এর অর্থ সুন্দর হওয়ার কারণে ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তা পড়ে, তবে তা গুনাহের কারণ হবে না; কিন্তু একে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুনিশ্চিত সুন্নত মনে করা যাবে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো ইফতারের সহিহ দোয়া
যেহেতু ‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু’ দোয়াটির সনদ দুর্বল, তাই আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর নিশ্চিত সুন্নত আমলটি গ্রহণ করাই আমাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও বরকতময়। বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত ইফতারের দোয়াটি হলো:
উচ্চারণ: জাহাবাজ্জামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু, ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।
অনুবাদ: তৃষ্ণা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং আল্লাহর ইচ্ছায় পুরস্কার (সওয়াব) নির্ধারিত হলো।
এই দোয়াটি সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৩৫৭-এ বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম দারা কুতনি ও আল্লামা আলবানি একে সহিহ ও হাসান হিসেবে সত্যায়ন করেছেন। সুন্নতের পূর্ণ সওয়াব অর্জনের লক্ষ্যে ইফতারের সময় এই দোয়াটি পড়াই শ্রেয়।
ইফতারের দোয়া আমল করার সঠিক সময় ও নিয়ম
ইফতারের সময় দোয়া পাঠের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার ও আদব রয়েছে, যা জানা থাকা জরুরি:
- খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা: ইফতারের সময় আজান হওয়ার পরপরই প্রথমে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পানি, খেজুর বা অন্য কোনো খাবার মুখে দিয়ে রোজা ভাঙবেন। এটিই ইসলামের সাধারণ নিয়ম।
- ইফতারের পরপরই দোয়া পড়া: সহিহ ‘জাহাবাজ জামাউ’ দোয়াটির অর্থ অতীতকালীন। অর্থাৎ ‘তৃষ্ণা দূর হলো’। তাই প্রথম চুমুক পানি পানের পর বা রোজা ভাঙার সাথে সাথেই এই দোয়াটি পাঠ করবেন।
- ইফতারের পূর্ব মুহূর্তের মোনাজাত: ইফতারের ঠিক আগের ১০-১৫ মিনিট সময় দোয়া কবুলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রোজাদারের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তাই এই সময় খাবার সামনে নিয়ে উদাসীন না থেকে বেশি বেশি ইস্তিগফার ও ব্যক্তিগত দোয়া করা উচিত। তবে মনে রাখা আবশ্যক যে, দোয়া বা জিকির আধ্যাত্মিক প্রশান্তির অন্যতম মাধ্যম হলেও তা কোনো চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং যেকোনো মানসিক বা শারীরিক অসুস্থতায় সুন্নতি দোয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রচলিত সাধারণ ভুলসমূহ
অনেকে মনে করেন ইফতারের মুখে খাবার রাখার আগেই দোয়া পড়ে নিতে হবে, যা একটি ভুল ধারণা। মূলত ইফতারের স্বাদ গ্রহণ বা পানি পানের পরই তৃষ্ণা দূর হওয়ার দোয়াটি পড়তে হয়। আবার অনেকে এই দোয়ার সাথে নিজেদের মতো ‘ওয়া বিকা আমানতু ওয়া আলাইকা তাওয়াক্কালতু’ শব্দগুলো জুড়ে দেন, যা কোনো নির্ভরযোগ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। তাই অতিরিক্ত মনগড়া শব্দ পরিহার করে হুবহু হাদিসের শব্দমালা উচ্চারণ করাই উত্তম।
রেফারেন্স (References)
হাদিসের উৎসসমূহ
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৩৫৮ (অধ্যায়: রোজা) — মুয়ায ইবনে জুহরাহ থেকে মুরসাল সূত্রে 'আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু' দোয়ার বর্ণনা, যা সনদের দিক থেকে যইফ (দুর্বল)।
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৩৫৭ — আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত ইফতারের সহিহ ও সুন্নতি দোয়ার বিবরণ।
প্রায়শ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু দোয়াটি পড়লে কি গুনাহ হবে?
না, এই দোয়াটি পড়লে কোনো গুনাহ হবে না। দোয়াটির অর্থ অত্যন্ত চমৎকার ও তাওহিদসম্মত। তবে যেহেতু এর হাদিসের সনদটি দুর্বল, তাই এটিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রমাণিত সুন্নত মনে না করে সাধারণ জিকির হিসেবে পড়া যেতে পারে। তবে সহিহ দোয়াটি পরাই সর্বোত্তম।
২. ইফতারের সহিহ দোয়াটি কখন পড়তে হয়?
সহিহ দোয়াটি (জাহাবাজ্জামাউ...) ইফতারের উপাদান বা পানি মুখে দিয়ে রোজা ভাঙার ঠিক পর মুহূর্তে পড়তে হয়। কারণ দোয়ার অর্থই হলো 'আমার তৃষ্ণা চলে গেছে এবং শিরাগুলো সিক্ত হয়েছে'।
৩. ইফতারের সময় দোয়া কবুল হওয়ার শর্তগুলো কী কী?
ইফতারের সময় দোয়া কবুলের অন্যতম শর্ত হলো—খাদ্য ও উপার্জন হালাল হওয়া, দোয়ার সময় পূর্ণ মনোযোগ ও একাগ্রতা থাকা, কোনো পাপ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়া না করা এবং দোয়ার ফল প্রাপ্তিতে তাড়াহুড়ো না করা।
৪. কোরআনে কি ইফতারের কোনো নির্দিষ্ট দোয়া আছে?
না, পবিত্র কুরআনে ইফতারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়ার উল্লেখ নেই। কুরআনে রোজার বিধান ও সময়সীমা বর্ণনা করা হয়েছে। ইফতারের দোয়াগুলো মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস থেকে প্রমাণিত।
উপসংহার
‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু’ দোয়াটির অর্থ সুন্দর হলেও হাদিস শাস্ত্রের বিচারে এটি দুর্বল। একজন মুমিনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশুদ্ধতম সুন্নতের অনুসরণ করা। তাই ইফতারের সময় বহুল প্রচলিত এই দুর্বল দোয়ার পরিবর্তে সহিহ সনদে প্রমাণিত ‘জাহাবাজ্জামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু...’ দোয়াটি আমল করাই আমাদের জন্য অধিক সওয়াব ও বরকতের কারণ হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ সুন্নতের আলোয় জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।

