পবিত্র রমজান মাস কিংবা নফল রোজার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো নিয়ত। আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে, রোজা রাখার জন্য বিশেষ কোনো আরবি দোয়া বা শব্দ মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক। অনেকেই সাহরির পর ‘নওয়াইতু আন আছুমা গাদান...’ বাক্যটি পড়ে থাকেন। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে ইবাদতের ক্ষেত্রে নিয়তের প্রকৃত অবস্থান কোথায় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে এর কোনো নির্দিষ্ট শব্দ প্রমাণিত কি না, তা জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক। এই নিবন্ধে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে রোজার নিয়তের সঠিক মাসআলা ও দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ইসলামে নিয়তের গুরুত্ব ও এর প্রকৃত অর্থ
ইসলামি শরিয়তে যেকোনো ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হলো বিশুদ্ধ নিয়ত। নিয়ত (نِيَّةٌ) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো মনের সংকল্প বা কোনো কাজ করার দৃঢ় ইচ্ছা। বিখ্যাত সাহাবি ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ীই প্রতিফল পাবে।’ হাদিসটি ইমাম বুখারি তাঁর সহীহ বুখারী, হাদিস ১-এ লিপিবদ্ধ করেছেন।
ফকহবিদ ও মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিয়তের স্থান হলো মানুষের অন্তরে, মুখে নয়। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি যখন রাতে বা সাহরির সময় মনে মনে এই ইচ্ছা পোষণ করে যে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আগামীকাল রোজা রাখবে, তখনই তার নিয়ত সম্পন্ন হয়ে যায়। মুখে আলাদা করে কোনো বাক্য বলার বাধ্যবাধকতা ইসলামে দেওয়া হয়নি।
প্রচলিত আরবি দোয়া 'নওয়াইতু আন আছুমা...' এর সত্যতা
আমাদের উপমহাদেশে রোজার নিয়তের দোয়া হিসেবে একটি সুনির্দিষ্ট আরবি বাক্য বহুল প্রচলিত, যা হলো: ‘নওয়াইতু আন আছুমা গাদান মিন শাহরি রমাদানিল মুবারাকি ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নী।’
হাদিস শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য উৎসসমূহ যেমন—সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ বা জামে তিরমিযী—কোথাও রাসূলুল্লাহ (সা.) কিংবা সাহাবায়ে কেরাম থেকে এই নির্দিষ্ট শব্দমালার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এটি মূলত পরবর্তী যুগের কিছু ফকিহ বা আলেমদের দ্বারা সাধারণ মানুষের বুঝানোর সুবিধার্থে তৈরি করা একটি খসড়া বাক্য ছিল, যা কালক্রমে মানুষের মুখে মুখে দোয়ায় রূপ নিয়েছে। যেহেতু এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়, তাই একে রোজার অবিচ্ছেদ্য বা আবশ্যক অংশ মনে করা ভুল।
রোজার নিয়ত করার হাদিসসম্মত সঠিক নিয়ম
ফরজ রোজার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, সুবহে সাদিকের পূর্বেই অন্তরে রোজা রাখার সংকল্প চূড়ান্ত করতে হবে। حفصة (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফজরের পূর্বে (রাতের মধ্যে) রোজার নিয়ত নিশ্চিত না করবে, তার কোনো রোজা নেই।’ এই হাদিসটি ইমাম আবু দাউদ তাঁর সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৪৫৪-এ এবং ইমাম তিরমিযী জামে তিরমিযী, হাদিস ৭৩০-এ বর্ণনা করেছেন (আল্লামা আলবানি একে সহিহ বলেছেন)।
সুতরাং সঠিক সুন্নতি পদ্ধতি হলো, রাতে ঘুমানোর সময় কিংবা সাহরি খাওয়ার সময় মনে মনে এই সংকল্প রাখা যে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রমজানের ফরজ রোজা রাখছি। সাহরি খেতে ওঠাই স্বয়ং একটি বড় নিয়ত, কারণ একজন মানুষ রোজা রাখার উদ্দেশ্যেই সাহরি খেয়ে থাকে। এর জন্য আলাদা করে কোনো আরবি বা বাংলা বাক্য মুখে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করার প্রয়োজন নেই। তবে কেউ যদি নিজের ভাষা বা মনের ভাব প্রকাশের জন্য মুখেও উচ্চারণ করে, তবে তাকে সুন্নাহ মনে না করে কেবল মনের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখতে হবে।
প্রচলিত ভুল ধারণা ও অসচেতনতা
১. দোয়া না পড়লে রোজা না হওয়ার ধারণা: অনেক সাধারণ মুসলিম মনে করেন যে এই প্রচলিত আরবি দোয়াটি মুখস্থ না থাকলে বা না পড়লে হয়তো রোজাই হবে না। এটি সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন ধারণা। অন্তরের ইচ্ছাই রোজা সহিহ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
২. আরবি ভাষা বাধ্যতামূলক মনে করা: ইবাদতের নিয়তের ক্ষেত্রে নিজের মাতৃভাষায় মনে মনে ভাবাই যথেষ্ট। ইসলামকে কঠিন না করে সুন্নাহর সহজ পদ্ধতির ওপর আমল করাই উম্মতের জন্য কল্যাণকর। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ইবাদতের ক্ষেত্রে সুন্নাহর অনুসরণ যেমন জরুরি, তেমনি মানুষের মানসিক বা আত্মিক প্রশান্তির জন্য জিকির অত্যন্ত উপকারী হলেও তা কোনো চিকিৎসাগত বা মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার বিকল্প নয়; শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় শরিয়তসম্মত উপায়ের পাশাপাশি যথাযথ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
রেফারেন্স (References)
কুরআন ও হাদিসের উৎস
- সহীহ বুখারী, হাদিস ১ (অধ্যায়: ওহীর সূচনা) — নিয়তের গুরুত্ব এবং আমল কবুল হওয়ার মূল ভিত্তি সংক্রান্ত বর্ণনা।
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৪৫৪ (অধ্যায়: রোজা) — ফরজ রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের পূর্বে সম্পন্ন করার অপরিহার্যতার দলিল।
- জামে তিরমিযী, হাদিস ৭৩০ (অধ্যায়: রোজা) — রাতে নিয়ত নিশ্চিত করা সংক্রান্ত হাদিসের সহিহ রূপ।
প্রায়শ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. রোজার নিয়ত মুখে উচ্চারণ করে বলা কি বিদআত?
যদি কেউ মুখে কোনো বাক্য উচ্চারণ করাকে রোজার জন্য আবশ্যক (ফরজ বা সুন্নত) মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে এটি ছাড়া রোজা অপূর্ণাঙ্গ থাকবে, তবে তা দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিষ্কার বা বিদআত হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মনের ইচ্ছা প্রকাশের জন্য কেউ মুখে বললে তা গুনাহ হবে না, তবে না বলাই উত্তম ও সুন্নাহসম্মত।
২. সাহরি খাওয়াই কি নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে?
হ্যাঁ, কোনো ব্যক্তি যদি রোজা রাখার উদ্দেশ্যে শেষ রাতে সাহরি খেতে জাগ্রত হয় এবং খাবার গ্রহণ করে, তবে তার এই কাজটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি শক্তিশালী নিয়ত বা অন্তরের সংকল্প হিসেবে গণ্য হবে। আলাদা করে মনে মনে ভাবারও আর বিশেষ প্রয়োজন থাকে না।
৩. নফল ও ফরজ রোজার নিয়তের সময়ে কি কোনো পার্থক্য আছে?
হ্যাঁ, রমজানের ফরজ রোজা এবং নির্দিষ্ট মানতের রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের পূর্বেই (রাতের বেলা) করা শর্ত। কিন্তু সাধারণ নফল রোজার ক্ষেত্রে যদি কেউ সুবহে সাদিকের পর দুপুরের পূর্ব পর্যন্ত কোনো কিছু পানাহার না করে থাকে, তবে সে দিনের বেলাতেও নফল রোজার নিয়ত করতে পারবে।
৪. নিয়ত করার পর যদি কেউ সুবহে সাদিকের আগে খাবার খায়, তবে কি নিয়ত ভেঙে যাবে?
না, নিয়ত ভেঙে যাবে না। রাতে বা সাহরির শুরুতে রোজা রাখার নিয়ত করার পরও সুবহে সাদিকের সময় হওয়া পর্যন্ত যেকোনো সময় পানাহার বা সাহরি খাওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ এবং এতে নিয়তের কোনো ক্ষতি হয় না।
উপসংহার
ইসলাম অত্যন্ত সহজ ও ফিতরাত বা স্বভাবজাত একটি দ্বীন। রোজার নিয়তের জন্য নির্দিষ্ট কোনো আরবি দোয়া বা শব্দের পেছনে না ছুটে সুন্নাহর মূল চেতনাকে ধারণ করাই আমাদের দায়িত্ব। অন্তরের খাঁটি সংকল্প ও একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রোজা রাখাই হলো প্রকৃত আমল। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান অর্জন করে সেই অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

