কোরবানি ইসলামের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ শিআর বা ইবাদত, যা সামর্থ্যবান মুমিনদের ওপর ওয়াজিব করা হয়েছে। কোরবানি করার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের এবং নিজের পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়ত ও বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন। অনেকেই জানতে চান, কোরবানি করার সময় পরিবারের सदस्योंের নাম মুখে উচ্চারণ করা জরুরি কি না কিংবা দোয়ার মধ্যে কীভাবে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সুন্নাহ সম্মত নিয়ম হলো, অন্তরের নিয়ত বা সংকল্পই মূল ভিত্তি, তবে মুখে সংক্ষিপ্ত বা দীর্ঘ দোয়ার মাধ্যমে পরিবারকে শামিল করা সম্পূর্ণ জায়েজ ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। এই নিবন্ধে সহিহ হাদিসের আলোকে কোরবানির দোয়ায় পরিবারের নাম অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম এবং এ সংক্রান্ত মাসায়েল বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
কোরবানির দোয়ার গুরুত্ব ও হাদিসের দলিল
কোরবানি করার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া এবং তাকবির ধ্বনি উচ্চারণ করা আবশ্যিক শর্ত। এর পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের ও পরিবারের জন্য আল্লাহর কাছে কবুলিয়তের আকুতি জানাতেন। সহীহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি দুম্বা কোরবানি করার সময় আল্লাহর নাম ও তাকবির বলার পর দোয়া করেছিলেন যেন আল্লাহ তা তাঁর নিজের, তাঁর পরিবার এবং পুরো উম্মতের পক্ষ থেকে কবুল করে নেন। অতএব, কোরবানির সময় পরিবারের কল্যাণ ও সওয়াবের উদ্দেশ্যে দোয়া করা একটি উত্তম সুন্নাহ সম্মত আমল।
কোরবানির মূল দোয়া ও উচ্চারণ
পশু জবাই করার সময় মূলত দুটি বিষয় মনে রাখতে হবে— একটি হলো পশু কিবলামুখী করার পর পড়ার দোয়া এবং অন্যটি হলো ছুরি চালানোর ঠিক মুহূর্তের আবশ্যিক জিকির।
১. জবাইয়ের মুহূর্তের আবশ্যিক জিকির
পশুর গলায় ছুরি চালানোর ঠিক শুরুতে এই বাক্যটি পাঠ করা আবশ্যক:
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার।
অনুবাদ: আল্লাহর নামে এবং আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
২. পরিবারকে শামিল করে কবুলিয়তের সুন্নাত দোয়া
পশু জবাই সম্পন্ন করার পর বা জবাইয়ের সময় পরিবারকে যুক্ত করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ মোতাবেক এই দোয়াটি পড়া যায়:
উচ্চারণ: ... [আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নি ওয়া মিন আহলি বাইতি।]
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আপনি আমার পক্ষ থেকে এবং আমার পরিবারের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন।
দোয়ায় পরিবারের নাম অন্তর্ভুক্ত করার সঠিক পদ্ধতি
কোরবানির সময় অংশীদার বা পরিবারের সদস্যদের নাম মুখে উচ্চারণ করা নিয়ে সমাজে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। শরিয়ত সম্মত সঠিক নিয়মটি নিচে স্পষ্ট করা হলো:
- انتরের নিয়তই যথেষ্ট: পশু ক্রয় করার সময় বা জবাইয়ের সময় অন্তরে এই ইচ্ছা থাকাই যথেষ্ট যে কোরবানিটি কার কার পক্ষ থেকে হচ্ছে। মুখে প্রত্যেকের নাম আলাদা করে উচ্চারণ করা জরুরি বা obligatoire নয়। কারণ আল্লাহ অন্তরের অন্তস্তলের খবর জানেন।
- সংক্ষিপ্ত সুন্নাত বাক্য: রাসুলুল্লাহ (সা.) কোটি কোটি উম্মত ও পরিবারের সবার নাম আলাদা করে মুখে বলেননি, বরং সংক্ষেপে 'ওয়া মিন আহলি বাইতি' (এবং আমার পরিবারের পক্ষ থেকে) বলেছিলেন। তাই এই সংক্ষিপ্ত দোয়াটি পড়লেই পরিবারের জীবিত ও মৃত সব সদস্য সওয়াবের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন।
- নাম উচ্চারণ করার নিয়ম: কেউ যদি সান্ত্বনা বা আনন্দের জন্য নির্দিষ্ট করে নাম উচ্চারণ করতে চান, তবে তাও জায়েজ। সেক্ষেত্রে জবাইয়ের পর বলা যেতে পারে: "হে আল্লাহ! আপনি আমার পক্ষ থেকে এবং আমার পিতা (অমুক), আমার স্ত্রী (অমুক) ও আমার সন্তান (অমুক)-এর পক্ষ থেকে কবুল করুন।" আরবিতে বলতে চাইলে 'মিন্নি'-এর জায়গায় 'মিন ফুলান' (অমুকের পক্ষ থেকে) বলা যায়।
অংশীদারী বা শরিকে কোরবানির ক্ষেত্রে নামের মাসায়েল
বড় পশু যেমন গরু, মহিষ বা উটে সর্বোচ্চ সাত ব্যক্তি শরিক হতে পারেন। শরিকে কোরবানি দেওয়ার সময় নামের ক্ষেত্রে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ রাখা সুন্নাত সম্মত:
যদি কোনো কসাই বা একজন ব্যক্তি সবার পক্ষ থেকে পশু জবাই করেন, তবে জবাইয়ের পূর্বে অংশীদারদের সবার নাম কাগজে লিখে নিয়ে মুখে পড়া জরুরি নয়। পশুর মালিকগণ যখন নিয়ত করে অর্থ প্রদান করেছেন, তখনই আল্লাহর দরবারে কার কার পক্ষ থেকে কোরবানি হচ্ছে তা সাব্যস্ত হয়ে গেছে। তবে কসাই বা জবাইকারী চাইলে সংক্ষেপে বলতে পারেন: "হে আল্লাহ! এই পশুতে যারা শরিক আছেন, আপনি সবার পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন।"
কোরবানির সময় করা কিছু সাধারণ ভুল
কোরবানি করার সময় সাধারণ কিছু ভুলের কারণে ইবাদতের সওয়াব ব্যাহত হতে পারে:
- নামের দীর্ঘ তালিকা পড়তে গিয়ে 'বিসমিল্লাহ' বলায় দেরি করা: অনেকে ছুরি চালানোর মুহূর্তে কসাইকে নাম পড়ে শোনান, যার কারণে ছুরি চালানোর আসল সময় পার হয়ে যায় বা মনোযোগ নষ্ট হয়। এটি অনুচিত; নাম যা বলার তা পশু শোয়ানোর পর ছুরি চালানোর আগেই বলে নেওয়া উচিত।
- রিয়া বা লোকদেখানো মনোভাব: সমাজে নাম জাহির করার জন্য বড় তালিকায় নাম পড়ার প্রতিযোগিতা করা অনুচিত, কারণ কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন।
পরিবারের কোরবানি নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
কোরবানির সময় পরিবারের কোনো সদস্যের নাম বাদ পড়লে কি কোরবানি হবে?
একটি ছাগল বা দুম্বা কি পুরো পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া যায়?
মৃত আত্মীয়দের নাম কি কোরবানির দোয়ায় শামিল করা যাবে?
কোরবানির দোয়া কি বাংলায় করা যাবে?
References
Quranic Ayahs
- সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৩৭ — আল্লাহর কাছে কোরবানির গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় কেবল তাকওয়া।
Hadith
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯৬৭ — রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক নিজের, নিজের পরিবার এবং উম্মতের পক্ষ থেকে দুম্বা কোরবানি করার এবং দোয়া পাঠের সহিহ দলিল।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৫৬৫ (অধ্যায়: কোরবানি) — রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজ হাতে কোরবানি করা এবং জবাইয়ের শুরুতে আল্লাহর নাম ও তাকবির বলার বর্ণনা।
- সুনান আবু দাওয়ুদ, হাদিস ২৭৯৫ (অধ্যায়: কোরবানি) — কোরবানির পশুকে কিবলামুখী করে দোয়া পাঠের সুন্নাহ সম্মত নিয়ম।
- সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩১২৫ (অধ্যায়: কোরবানি) — জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোরবানির দোয়া ও পরিবারকে শামিল করার বিবরণ।

