কুরবানি ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। অনেক সময় মানুষ নিজের পক্ষ থেকে ছাড়াও আত্মীয়-স্বজন, পিতা-মাতা বা মৃত প্রিয়জনদের পক্ষ থেকে কুরবানি করতে চান। অন্যের পক্ষে কুরবানি করার শরয়ি নিয়ম এবং এর জন্য সুনির্দিষ্ট দুআ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা আবশ্যক।
কুরবানি করার সময় দুআ
পশু জবাই করার সময় মহান আল্লাহর নাম নেওয়া ফরজ। এটি কুরবানির শুদ্ধতার প্রধান শর্ত। সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে পশু জবাইয়ের সময় পড়ার জন্য নির্দিষ্ট দুআ রয়েছে যা সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত।
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার। আল্লাহুম্মা হাজা মিনকা ওয়া লাক।
অনুবাদ: আল্লাহর নামে, আল্লাহ মহান। হে আল্লাহ! এই কুরবানি তোমার পক্ষ থেকেই (প্রদত্ত সম্পদ) এবং তোমারই জন্য।
যদি নিজের পক্ষ থেকে না হয়ে অন্যের পক্ষ থেকে কুরবানি করা হয়, তবে 'লাকা' শব্দের পর ‘আন’ (عَنْ) বলে ওই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা যায়। যেমন: আল্লাহুম্মা হাজা মিনকা ওয়া লাকা আন [ব্যক্তির নাম]। তবে নাম উল্লেখ করা জরুরি নয়, অন্তরে নিয়ত থাকাই যথেষ্ট।
অন্যের পক্ষে কুরবানির মাসায়েল
অন্যের পক্ষ থেকে কুরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ও শর্ত রয়েছে যা অনুসরণ করা জরুরি:
অনুমতি গ্রহণ: জীবিত কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করতে চাইলে তার অনুমতি নেওয়া উত্তম। তবে যদি কেউ অনুমতি ছাড়াই অন্যের নামে কুরবানি দিয়ে দেয় এবং ওই ব্যক্তি পরবর্তীতে তা মেনে নেয়, তবে কুরবানি আদায় হয়ে যাবে।
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি: মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করা জায়েজ। যদি মৃত ব্যক্তি ওসিয়ত করে গিয়ে থাকেন, তবে সেই কুরবানির গোশত গরিবদের মাঝে বিতরণ করা ওয়াজিব। আর যদি ওসিয়ত ছাড়া নিজ উদ্যোগে করা হয়, তবে তা নফল কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে এবং এর সওয়াব মৃত ব্যক্তি পাবেন।
নিয়াত: কুরবানির মূল ভিত্তি হলো নিয়ত। জবাই করার সময় মুখে নাম উচ্চারণ করা জরুরি নয়, বরং জবাইকারী ও কুরবানি দাতার অন্তরে নিয়ত থাকা যথেষ্ট।
সতর্কতা ও ভুল ধারণা
অনেকে মনে করেন, দুআ ছাড়া কুরবানি কবুল হবে না বা এটি ইবাদতের মূল ভিত্তি। মনে রাখতে হবে, কুরবানি কবুল হওয়ার মূল শর্ত হলো ইখলাস বা আল্লাহর সন্তুষ্টি। এছাড়া প্রচলিত কিছু কথা যেমন 'দুআ ইবাদতের মগজ', এটি একটি দুর্বল হাদিস। এর পরিবর্তে সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, দুআই হলো ইবাদত (সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২৯৬৯)। তাই কোনো প্রকার মনগড়া কথা বা ভিত্তিহীন কথাকে হাদিস হিসেবে প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
কুরবানির অন্যান্য শর্তাবলি
অন্যের পক্ষে হোক বা নিজের, কুরবানির ক্ষেত্রে পশুর বয়স এবং সুস্থতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। কুরবানির পশুতে যদি অংশীদারিত্ব থাকে, তবে প্রত্যেকের নিয়ত হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। যদি কারো নিয়ত গোশত খাওয়ার বা লোক দেখানো হয়, তবে সবার কুরবানি ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে।
রেফারেন্স
কুরআনুল কারীম
- সূরা আল-কাওসার, ১০৮:২ — আল্লাহর উদ্দেশ্যে সালাত ও কুরবানি করার নির্দেশ।
হাদীস শরীফ
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৫৬৫ — পশু জবাইয়ের সময় তাসমিয়া পাঠ।
- সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২৯৬৯ — দুআ ইবাদত হওয়ার প্রমাণ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯৬৬ — নবি কারীম (সা.)-এর কুরবানির নিয়ম ও দুআ।

