কুরবানির নিয়ত: মুখে বলা নাকি মনের ইচ্ছা? জানুন সঠিক ইসলামিক বিধান

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬ফিকহ

কুরবানি ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। যেকোনো ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার জন্য 'নিয়াত' বা সংকল্প একটি মৌলিক শর্ত। তবে আমাদের সমাজে কুরবানির নিয়ত নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, নির্দিষ্ট কিছু আরবি শব্দ বা দোয়া মুখে উচ্চারণ না করলে হয়তো কুরবানি শুদ্ধ হবে না।

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, নিয়ত মূলত অন্তরের কাজ, মুখের কোনো উচ্চারণ নয়। কুরবানির পশু কেনার সময় বা জবাই করার সময় অন্তরে এই ইচ্ছা থাকাই যথেষ্ট যে, এই কাজটি একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হচ্ছে। এই নিবন্ধে আমরা কুরআন, সহিহ হাদিস এবং ফকিহদের সুনিশ্চিত মতামতের আলোকে কুরবানির নিয়তের সঠিক বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

কুরবানির নিয়ত মূলত মনের বিষয় এবং অন্তরের দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমেই এটি সম্পন্ন হয়। মুখে নির্দিষ্ট কোনো আরবি বা বাংলা বাক্য উচ্চারণ করা কুরবানি সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত নয় এবং এটি রাসুলুল্লাহ (সা.) কিংবা সাহাবিদের থেকে প্রমাণিত কোনো সুন্নতও নয়। তবে পশু জবাই করার সময় 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলা শরিয়তের একটি স্বতন্ত্র এবং আবশ্যকীয় নির্দেশ।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে নিয়তের বিধান

ইসলামের যাবতীয় ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো নিয়ত। মহান আল্লাহ মানুষের অন্তরের অবস্থা ও তাকওয়া দেখেন, বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা বা রক্ত-মাংস নয়। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে ইরশাদ হয়েছে:

لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ

অনুবাদ: আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না ওগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত ৩৭

হাদিস শরিফে নিয়তের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বিখ্যাত উক্তি বর্ণিত হয়েছে। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ

অনুবাদ: সমস্ত কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। সহীহ বুখারী, হাদিস ১

যেহেতু নিয়ত অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত, তাই মুখে উচ্চারণ না করলেও ইবাদত পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় হয়ে যাবে। পশু জবাইয়ের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর নাম ও তাকবির পাঠ করতেন, যা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে দুটি শিংওয়ালা চিতি রঙের দুম্বা কুরবানি করেছেন এবং তিনি 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলেছেন। (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯৬৬)

আলেম ও ফকিহদের সুচিন্তিত মতামত

চার মাজহাবের ইমামগণ এবং সমস্ত যুগশ্রেষ্ঠ ইসলামিক স্কলার এ বিষয়ে একমত যে, নিয়তের স্থান হলো অন্তর (আল-নিয়্যাতু মাহাল্লুহা আল-কাল্ব)। ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) তাঁর ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন, মুখে নিয়ত উচ্চারণ করা ইসলামে বাধ্যতামূলক নয় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) কিংবা তাঁর খলিফাগণ ইবাদতের শুরুতে উচ্চস্বরে নিয়ত পড়েছেন বলে কোনো প্রমাণ নেই।

হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য ফিকহের কিতাবসমূহে বলা হয়েছে, মুখে নিয়ত বলাকে যদি কেউ আবশ্যক বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা মনে করে, তবে তা শরিয়তের পরিপন্থী হবে। তবে কোনো ব্যক্তি যদি নিজের মনের একাগ্রতা ও মনোযোগ ধরে রাখার জন্য মুখে সাধারণ কোনো বাক্য বলে (যেমন: 'হে আল্লাহ, আমি আপনার উদ্দেশ্যে কুরবানি করছি'), তবে তা জায়েজ, কিন্তু একে দ্বীনের অংশ বা জরুরি বিধান মনে করা যাবে না।

কুরবানির নিয়ত ও জবাই করার সঠিক পদ্ধতি

কুরবানির পশু জবাই করার সময় সুন্নাহসম্মত এবং সঠিক পদ্ধতিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • অন্তরের নিয়ত স্থির করা: পশু জবাইয়ের পূর্বে মনে মনে এই সংকল্প নিশ্চিত করুন যে, এই কুরবানিটি একমাত্র আল্লাহর ইবাদত হিসেবে আদায় করা হচ্ছে।
  • পশুকে কিবলামুখী করা: জবাইয়ের সময় পশুকে বাম কাতে কিবলামুখী করে শোয়ানো সুন্নাত।
  • তাকবির পাঠ করা: ছুরি চালানোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে স্পষ্ট ও উচ্চস্বরে 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নাম ছেড়ে দিলে সেই পশুর গোশত খাওয়া হালাল হবে না।
  • দোয়া পাঠ (ঐচ্ছিক): রাসুলুল্লাহ (সা.) জবাইয়ের পর 'আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নি...' (হে আল্লাহ, এটি আমার পক্ষ থেকে কবুল করুন) বলে দোয়া করতেন। কেউ চাইলে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার দোয়া করতে পারেন।

কুরবানির নিয়ত নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

আমাদের সমাজে কুরবানির নিয়ত ও দোয়া নিয়ে বেশ কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যা সংশোধন করা জরুরি:

  • আরবি দোয়া বাধ্যতামূলক মনে করা: অনেকে 'ইন্নি ওয়াজ্জাহতু...' দোয়াটিকে কুরবানির নিয়ত মনে করেন এবং এটি না পড়লে কুরবানি হবে না বলে ভুল বিশ্বাস রাখেন। প্রকৃতপক্ষে এটি কুরবানির বিশেষ কোনো নিয়ত নয়, বরং এটি একটি সাধারণ দোয়া যা রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কখনো পড়েছেন।
  • প্রতিনিধির নিয়ত নিয়ে সংশয়: যিনি কুরবানি দিচ্ছেন তিনি নিজে উপস্থিত না থাকলেও এবং কসাই বা অন্য কেউ জবাই করলেও কুরবানি দাতার অন্তরের নিয়তের কারণেই কুরবানি সহিহ হয়ে যায়। জবাইকারীর নিজের মুখে দাতার নাম উচ্চারণ করা জরুরি নয়।
  • লৌকিকতা বা রিয়া: লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কিংবা সমাজে মর্যাদা ধরে রাখার জন্য কুরবানি করলে নিয়ত নষ্ট হয়ে যায় এবং কুরবানি বাতিল হয়ে যায়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

কুরবানির নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা কি ফরজ বা ওয়াজিব?

না, কুরবানির নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা ফরজ বা ওয়াজিব কোনোটিই নয়। নিয়ত হলো অন্তরের ইচ্ছা। অন্তরে কুরবানির ইচ্ছা থাকলেই কুরবানি পুরোপুরি সহিহ হয়ে যাবে।

জবাই করার সময় 'বিসমিল্লাহ' বলা কি বাধ্যতামূলক?

হ্যাঁ, পশু জবাই করার সময় আল্লাহর নাম বা 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলা অত্যন্ত জরুরি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহর নাম না নেওয়া পশুর গোশত খেতে নিষেধ করা হয়েছে।

অন্যের পক্ষে কুরবানি করার সময় কার নিয়ত করতে হবে?

যিনি কুরবানির অর্থ দিচ্ছেন বা যার পক্ষ থেকে কুরবানি করা হচ্ছে, পশুর মালিক হিসেবে তার অন্তরের নিয়তই মূল। জবাইকারী ব্যক্তি শুধু আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করলেই তা দাতার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে।

কুরবানির পশু কেনার সময়ই কি নিয়ত হয়ে যায়?

হ্যাঁ, যখন একজন মুসলমান কুরবানির উদ্দেশ্যে কোনো পশু কেনেন, তখনই তার অন্তরে নিয়ত বা ইবাদতের সংকল্প প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। জবাইয়ের সময় আলাদা করে মুখে কিছু না বললেও কুরবানি সম্পন্ন হবে।

উপসংহার

ইসলাম অত্যন্ত সহজ ও ফিতরাতভিত্তিক একটি জীবনব্যবস্থা। কুরবানির মতো একটি মহান ইবাদতকে নিয়তের মৌখিক আনুষ্ঠানিকতার বেড়াজালে ফেলে জটিল করার কোনো অবকাশ নেই। মনের গভীর থেকে খাঁটি নিয়ত এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষাই কুরবানি কবুল হওয়ার মূল চাবিকাঠি। তাই লোকদেখানো মানসিকতা পরিহার করে সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে সহিহ নিয়তে কুরবানি আদায় করাই প্রতিটি মুসলিমের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

তথ্যসূত্র

পবিত্র কুরআন

হাদিস শরিফ

  • সহীহ বুখারী, হাদিস ১ (অধ্যায়: ওহীর সূচনা) — সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল হওয়া প্রসঙ্গে।
  • সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৯৬৬ (অধ্যায়: কুরবানি) — রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কুরবানি ও জবাইয়ের সময় তাকবির পাঠের সুন্নাহ।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না