ইহরামের দোয়া: নিয়ত, তালবিয়া ও সুন্নাত আমলের সম্পূর্ণ গাইড

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬হজ ও ওমরাহ

হজ ও উমরাহ পালনের সর্বপ্রথম এবং অন্যতম প্রধান ফরজ রোকন হলো ইহরাম। ইহরাম মূলত কেবল নির্দিষ্ট দুটি সাদা কাপড় পরিধান করার নাম নয়, বরং এটি হলো হজ বা উমরার উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্তে ইবাদতে প্রবেশ করার একটি পবিত্র আত্মিক সংকল্প। মিকাত বা শরিয়ত নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করার পূর্বে ইহরামের নিয়ত করা এবং তালবিয়া পাঠ করা আবশ্যক। এই নিবন্ধে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে ইহরামের সঠিক নিয়ত, তালবিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সুন্নাত দোয়াসমূহ আরবী, উচ্চারণ ও অর্থসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ইহরামের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ইহরামের মাধ্যমে একজন মুমিন বান্দা দুনিয়াবি সমস্ত জাঁকজমক, অহংকার ও পোশাকের আভিজাত্য বিসর্জন দিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও সমর্পিত হিসেবে উপস্থিত হয়। ইহরাম বাঁধার পর থেকে উমরা বা হজের নির্দিষ্ট রোকন সম্পন্ন করার পূর্ব পর্যন্ত কিছু সাধারণ হালাল কাজও (যেমন সুগন্ধি ব্যবহার, নখ বা চুল কাটা, স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি) সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মিকাত থেকে ইহরাম সম্পন্ন করার সময় নির্দিষ্ট নিয়মে জিকির ও তালবিয়া পাঠ করতেন, যা উম্মতের জন্য অনুসরণীয় সুন্নাত।

১. ইহরামের নিয়ত (Niyyah)

যেকোনো ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো নিয়ত বা সংকল্প। ইহরামের ক্ষেত্রে অন্তরের সংকল্পই মূল ফরজ, তবে মুখে তা উচ্চারণ করা সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত। উমরা বা হজের প্রকারভেদে নিয়তের শব্দে কিছুটা ভিন্নতা আসে।

উমরার জন্য ইহরামের নিয়ত

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ عُمْرَةً

উচ্চারণ: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা উমরাতান।

অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি উমরার উদ্দেশ্যে আপনার দরবারে হাজির হলাম। (সহীহ বুখারী, হাদিস ১৫৫১)

হজের জন্য ইহরামের নিয়ত

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ حَجًّا

উচ্চারণ: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা হাজ্জান।

অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি হজের উদ্দেশ্যে আপনার দরবারে হাজির হলাম। (সহীহ বুখারী, হাদিস ১৫৪৪)

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমাদের সমাজে প্রচলিত দীর্ঘ আরবী নিয়ত যেমন “নাওয়াইতুল হাজ্জা ওয়া আহরামতু বিহি...” ইত্যাদি শব্দগুলো রাসুলুল্লাহ (সা.) বা সাহাবিদের থেকে সরাসরি প্রমাণিত নয়। তবে কেউ আরবী না জানলে নিজের মাতৃভাষায় অন্তরে স্পষ্ট নিয়ত করলেই ইহরাম শুদ্ধ হয়ে যাবে।

২. ইহরামের মূল জিকির: তালবিয়া (Talbiyah)

নিয়ত করার পরপরই ইহরামের মূল স্লোগান বা জিকির 'তালবিয়া' পাঠ করতে হয়। তালবিয়া পাঠের মাধ্যমেই মূলত ইহরামের নিষেধাজ্ঞাগুলো কার্যকর হয়।

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ

উচ্চারণ: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলকা, লা শারিকা লাক।

অনুবাদ: আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা, নিয়ামত এবং রাজত্ব একমাত্র আপনারই, আপনার কোনো অংশীদার নেই। (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১১৮৪)

তালবিয়া পাঠের নিয়ম ও আদব

পুরুষদের জন্য ইহরাম বাঁধার পর থেকে উচ্চকণ্ঠে তালবিয়া পাঠ করা সুন্নাত। পক্ষান্তরে, নারীরা নিচু স্বরে তালবিয়া পাঠ করবেন যেন পরপুরুষের কান পর্যন্ত তা না পৌঁছায়। পথ চলতে, আরোহণে, অবতরণে, ফরজ নামাজের পর এবং নতুন কোনো কাফেলার সাথে দেখা হলে বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করা সুন্নাতসম্মত আমল।

৩. ইহরামের অন্যান্য সুন্নাত বাক্য ও দোয়া

মিকাত থেকে ইহরামের চাদর পরিধানের পর যদি মকরুহ সময় না হয়, তবে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহরাম বাঁধার পর মহান আল্লাহর প্রশংসা (তাহমিদ), পবিত্রতা (তাসবিহ) এবং একত্ববাদের জিকির (তাহলিল) করতেন।

হাদিসে এসেছে, আনাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বাহনে আরোহণের পর সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করে হজের নিয়ত করেছিলেন। (সহীহ বুখারী, হাদিস ১৫৫১)। তাছাড়া, ইহরামের পর আল্লাহর কাছে হজের আমলগুলো সহজ হওয়ার এবং তা কবুল হওয়ার জন্য যেকোনো সাধারণ দোয়া করা মুস্তাহাব।

ইহরামের সময় সাধারণ ভুলত্রুটিসমূহ

  • বানোয়াট দীর্ঘ আরবী নিয়ত মুখে বলা: রাসুল (সা.) ও সাহাবিগণ থেকে প্রমাণিত সংক্ষিপ্ত সুন্নাত শব্দের বাইরে বানোয়াট আরবী বাক্য উচ্চারণ করে দীর্ঘ নিয়ত করা সুন্নাহ পরিপন্থী।
  • নারীদের উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়া: অনেক নারী হজের কাফেলায় পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়েন, যা শরিয়তসম্মত নয়। নারীরা সর্বদা নিজের কানে শোনার মতো নিচু স্বরে পড়বেন।
  • নিয়ত ছাড়া কেবল কাপড় পরা: অনেকে মনে করেন ইহরামের কাপড় পরলেই ইহরাম হয়ে যায়। আসলে নিয়ত ও তালবিয়া না পড়া পর্যন্ত ইহরাম সম্পন্ন হয় না।

রেফারেন্স

কুরআনের আয়াত

হাদিস শরিফ

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

ইহরামের নিয়ত মুখে আরবী ভাষায় বলা কি বাধ্যতামূলক?

না, আরবী ভাষায় নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক নয়। নিয়ত হলো মনের সংকল্প। রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রমাণিত সুন্নাত বাক্য 'লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা উমরাতান' বা 'লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা হাজ্জান' বলা উত্তম। তবে কেউ মুখে কিছু না বলে মনে মনে স্পষ্ট সংকল্প করলেও ইহরাম হয়ে যাবে।

মিকাত অতিক্রম করার পর তালবিয়া পড়তে ভুলে গেলে কী হবে?

যদি কেউ মিকাত অতিক্রম করার সময় উমরা বা হজের নিয়ত মনে স্পষ্ট করে থাকেন, তবে তার ইহরাম হয়ে যাবে। কিন্তু যদি নিয়ত ও তালবিয়া উভয়টিই বাদ পড়ে যায় এবং মিকাত অতিক্রম করে মক্কায় প্রবেশ করে, তবে তার ওপর একটি 'দম' বা কোরবানি ওয়াজিব হবে অথবা তাকে পুনরায় মিকাতে ফিরে গিয়ে ইহরাম বাঁধতে হবে।

ঋতুস্রাব বা অপবিত্র অবস্থায় নারীরা কি ইহরামের দোয়া ও নিয়ত করতে পারবেন?

হ্যাঁ, ঋতুস্রাব (হায়েজ) অবস্থায় নারীরা গোসল করে ইহরামের কাপড় পরে হজের বা উমরার নিয়ত ও তালবিয়া পাঠ করতে পারবেন। তবে এই অবস্থায় তারা নামাজ ও কাবা শরিফের তাওয়াফ করতে পারবেন না। পবিত্র হওয়ার পরই কেবল তাওয়াফ সম্পন্ন করবেন।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না