তওয়াফের দোয়া: সুন্নাহ কী এবং নিজের ভাষায় দোয়া পড়ার বিধান

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬হজ ও ওমরাহ

তওয়াফ হলো পবিত্র কাবা শরিফ প্রদক্ষিণ করার এক মহান ইবাদত, যা হজ ও উমরার অন্যতম প্রধান রুকন। তওয়াফ করার সময় কোন কোন দোয়া পাঠ করা সুন্নাহ এবং নিজের মাতৃভাষায় আল্লাহর কাছে মনের আকুতি ব্যক্ত করা যাবে কিনা, তা নিয়ে অনেক মুসলিমের মনেই জিজ্ঞাসা থাকে। এই নিবন্ধে তওয়াফের সুন্নাহসম্মত দোয়া, নিজের ভাষায় দোয়া করার শরয়ী বিধান এবং তওয়াফকালীন জিকিরের নিয়মাবলি নির্ভরযোগ্য দলিলসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ইসলামি শরিয়তের অন্যতম সৌন্দর্য হলো, এটি ইবাদতকে মানুষের জন্য সহজ ও আন্তরিক করেছে। তওয়াফের মতো একটি পুণ্যময় মুহূর্তে বান্দা যেন আল্লাহর সবচেয়ে কাছাকাছি অনুভব করতে পারে, সেজন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন এবং পাশাপাশি সাধারণ জিকির ও দোয়ার উন্মুক্ত সুযোগ রেখেছেন।

তওয়াফে সুন্নাহ সম্মত দোয়া ও জিকির

তওয়াফের সময় প্রতিটি চক্করের জন্য আলাদা বা নির্দিষ্ট কোনো দোয়া ইসলামি শরিয়তে নির্ধারিত বা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম থেকে তওয়াফের কিছু বিশেষ অংশের মাসনুন আমল ও দোয়া প্রমাণিত রয়েছে, যা অনুসরণ করা প্রতিটি মুমিনের জন্য উত্তম।

তওয়াফ শুরু করার সময় হাজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করে হাত ইশারা বা স্পর্শ (ইস্তিলাম) করার সময় “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলা সুন্নাহ। এরপর তওয়াফকালীন সময়ে সাধারণ জিকির, তাসবিহ এবং ইস্তিগফারের মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করা মোস্তাহাব।

রুকনুল ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানের সুন্নাহ দোয়া

সমগ্র তওয়াফের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং হাদিস দ্বারা প্রমাণিত সুনির্দিষ্ট দোয়াটি পাঠ করা হয় রুকনুল ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী অংশে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই অংশে পবিত্র কুরআনের একটি বিখ্যাত দোয়া পাঠ করতেন।

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ: রাব্বানা- আ-তিনা- ফিদ্দুন্‌ইয়া- হাসানাতাও ওয়া ফিল আ-খিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা- ‘আযা-বান্না-র।

অনুবাদ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।

এই আমলটি সম্পর্কে সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৮৯২-এ সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে, যেখানে আবদুল্লাহ ইবনে সাইব (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দুই রুকনের মাঝে এই দোয়াটি পড়তে শুনেছেন।

তওয়াফে নিজের ভাষায় দোয়া পড়ার শরয়ী বিধান

অনেক হাজির মনে সংশয় থাকে যে, আরবি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় তওয়াফের সময় দোয়া করা জায়েজ কিনা। ইসলামি ফিকহের প্রসিদ্ধ ইমামদের ফাতাওয়া অনুযায়ী, তওয়াফের সময় নিজের মাতৃভাষায় আল্লাহর কাছে যেকোনো বৈধ বিষয়ে পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ কামনা করে দোয়া করা সম্পূর্ণ জায়েজ এবং মোস্তাহাব।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁর ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন যে, তওয়াফের জন্য শরিয়তে বিশেষ কোনো জিকির বা বাক্য মানুষের ওপর অবধারিত করা হয়নি। মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী আল্লাহর কাছে যেকোনো ভাষায় প্রার্থনা করতে পারে। তবে জিকির বা দোয়ার ক্ষেত্রে উচ্চস্বরে চিৎকার করে অন্য হাজিদের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটানো মাকরুহ বা অপছন্দনীয়।

তওয়াফের সময় পাঠ করার মতো কিছু সাধারণ জিকির

তওয়াফের চক্করগুলোতে হাজিগণ যেকোনো তাসবিহ বা জিকির জবান সচল রাখতে পারেন। হাদিস শরিফে যে চারখণ্ড বাক্যের বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, তা তওয়াফের সময় বেশি বেশি পড়া যেতে পারে:

سُبْحَانَ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ

উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।

অনুবাদ: আল্লাহ পবিত্র, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং আল্লাহ সর্বমহান।

এই জিকিরটি সম্পর্কে সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ২৯২২-এ এসেছে যে, যে ব্যক্তি কাবা শরিফ তওয়াফের সময় এই বাক্যগুলো বলবে, তার জন্য বিশেষ সওয়াব লিপিবদ্ধ করা হয়।

তওয়াফকালীন সময়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, তওয়াফের সাতটি চক্করের প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আলাদা বিশেষ দোয়ার বই দেখে হুবহু আরবি পড়তে হবে। অনেক সময় অর্থ না বুঝেই মানুষ দলবদ্ধভাবে উচ্চস্বরে এই দোয়াগুলো পড়ে থাকে। এর ফলে কাবার চত্বরে হট্টগোল তৈরি হয়, যা তওয়াফের আদব পরিপন্থী।

সহিহ হাদিসের আলোকে প্রতিটি চক্করের জন্য পৃথক কোনো দোয়ার অস্তিত্ব প্রমাণিত নয়। আরেকটি ভুল ধারণা হলো, নিজের ভাষায় দোয়া করলে হয়তো তওয়াফের সওয়াব কমে যায় বা তওয়াফ অপূর্ণাঙ্গ থেকে যায়। এটি ভুল; বরং নিজের ভাষায় গভীর মনোযোগ ও আকুতির সাথে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, অর্থ না বুঝে তোতাপাখির মতো মুখস্থ আরবি বলার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও আন্তরিক।

তওয়াফের আদব ও সাধারণ নির্দেশনা

তওয়াফ এক প্রকারের সালাত বা নামাযেরই সমতুল্য, কেবল এতে হাঁটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাই তওয়াফ অবস্থায় অনর্থক দুনিয়াবি কথাবার্তা, মোবাইল ফোন ব্যবহার বা ছবি তোলা থেকে বিরত থাকা উচিত। অন্তরে আল্লাহর ভয় ও বিনয় বজায় রেখে ধীরস্থিরভাবে পদবিক্ষেপ করা এবং অন্যের গায়ে ধাক্কা না দেওয়া তওয়াফের গুরুত্বপূর্ণ আদব।

তথ্যসূত্র

কুরআনিক আয়াত

হাদিস

তওয়াফের সময় কি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ?

হ্যাঁ, তওয়াফের সময় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ রয়েছে। তবে অনেক ফকিহ মনে করেন, তওয়াফ যেহেতু দোয়ার স্থান, তাই কুরআন তিলাওয়াতের চেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো জিকির ও আল্লাহর কাছে নিজের ভাষায় ইস্তিগফার বা দোয়া করাই উত্তম।

তওয়াফের দোয়া মনে মনে পড়লে কি আদায় হবে?

দোয়া এবং জিকির মুখে মৃদু উচ্চারণে বলাই নিয়ম, যেন নিজের কান তা শুনতে পায়। তবে ভিড়ের মধ্যে বা শারীরিক কষ্টের সময় অন্তরে বা মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেও আল্লাহ তা কবুল করেন, তবে জবান নাড়িয়ে নিচু স্বরে পড়া উত্তম।

তওয়াফের মাঝে কোনো চক্করে দোয়া পড়তে ভুলে গেলে কি দণ্ড বা দম দিতে হবে?

না, তওয়াফের চক্করগুলোতে দোয়া বা জিকির করা সুন্নাত বা মোস্তাহাব আমল, ওয়াজিব নয়। তাই কোনো চক্করে ভুলে দোয়া না পড়লে বা চুপ থাকলেও তওয়াফ সম্পূর্ণ সহিহ হয়ে যাবে এবং এর জন্য কোনো জরিমানা বা দণ্ড (দম) দিতে হবে না।

দলবদ্ধভাবে একজন আগে আগে বলে এবং বাকিরা উচ্চস্বরে তার পেছনে তওয়াফের দোয়া পড়ে—এই নিয়মের বিধান কী?

যদি এই দলবদ্ধ দোয়ার কারণে অন্যান্য হাজিদের মনোযোগ নষ্ট হয় বা উচ্চস্বরে চিল্কারের সৃষ্টি হয়, তবে তা মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। সবচেয়ে উত্তম হলো প্রত্যেকে নিজে নিজে নিচু স্বরে আল্লাহর কাছে নিজ নিজ আকুতি পেশ করা।

উপসংহার

তওয়াফ হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য মুহূর্ত। তাই কৃত্রিম বা মনগড়া নিয়মে আবদ্ধ না হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশিত সুন্নাহর অনুসরণ করাই শ্রেয়। রুকনুল ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝে মাসনুন দোয়াটি পাঠ করার পাশাপাশি বাকি সময়ে নিজের ভাষায় একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে রোনাজারি করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সুন্নাহ মোতাবেক মকবুল তওয়াফ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না