একটি আদর্শ মুসলিম পরিবার গঠনে পারস্পরিক ভালোবাসার পাশাপাশি মহান আল্লাহর দরবারে সুরক্ষা প্রার্থনা করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান যুগে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নানা ধরনের ফিতনা, হিংসা, নজর লাগা এবং জিন-শয়তানের অনিষ্টতা থেকে নিজের পরিবারকে নিরাপদ রাখা প্রতিটি গৃহকর্তা ও মুসলিম সদস্যের প্রধান দায়িত্ব। পবিত্র কুরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহিহ সুন্নাহে ঘর ও পরিবারের সুরক্ষায় বেশ কিছু বরকতময় দোয়া ও আমলের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এই নিবন্ধে প্রামাণ্য সূত্রসহ এমন ৫টি শক্তিশালী দোয়া ও আমল আলোচনা করা হলো, যা নিয়মিত পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা পরিবারকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন।
পরিবারের নিরাপত্তার দোয়া কেন প্রয়োজনীয়?
ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবার হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া একটি পবিত্র আমানত। শয়তান মানুষের চিরশত্রু এবং সে সর্বদা মুমিনের পরিবারে অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টির পাঁয়তারা করে। আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর নিজের পরিবার ও নাতিদের সুরক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। এই আমলগুলো কেবল একটি প্রথা নয়, বরং আল্লাহর প্রতি গভীর তাওয়াক্কুল বা ভরসার বহিঃপ্রকাশ। তবে মনে রাখতে হবে, যেকোনো দোয়া কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো—হালাল উপার্জন, অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস এবং তাড়াহুড়ো না করা।
পরিবারের নিরাপত্তার জন্য ৫টি শ্রেষ্ঠ দোয়া ও সূরা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ বিশ্লেষণ করে ঘর ও পরিবারের হেফাজতের জন্য যে সমস্ত আমল পাওয়া যায়, তার মধ্যে শীর্ষ ৫টি নিচে দেওয়া হলো:
১. আয়াতুল কুরসি (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৫)
পবিত্র কুরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত হলো আয়াতুল কুরসি। এটি ঘর এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি অনন্য আধ্যাত্মিক দুর্গ হিসেবে কাজ করে।
উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম, লা তা’খুযুহু সিনাতুওঁ ওয়ালা নাওম, লাহু মা ফিসসামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ্ব, মান যাল্লাযী ইয়াশফাউ ‘ইন্দাহু ইল্লা বিইযনিহ, ইয়া‘লামু মা বাইনা আইদীহিম ওয়ামা খালফাহুম, ওয়ালা যুহীতূনা বিশাইয়িম মিন ‘ইলমিহী ইল্লা বিমা শায়ূআ, ওয়াসি‘আ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব, ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফযুহুমা ওয়া হুয়াল ‘আলিইয়্যুল ‘আযীম।
অনুবাদ: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই; তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমানসমূহে যা রয়েছে এবং জমিনে যা রয়েছে সবই তাঁর। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর নিকট সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। আর যা তিনি ইচ্ছা করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছু তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর কুরসি আসমানসমূহ ও জমিনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দুটির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। আর তিনি মহোচ্চ, মহীয়ান।
আমলের নিয়ম ও ফজিলত: এই আয়াতটি পবিত্র কুরআনের সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৫। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, রাতে ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সুরক্ষাকারী ফেরেশতা নিযুক্ত হন এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান সেই ঘরের কাছে আসতে পারে না।
২. সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস (মুআওবিযাতাইনি)
যাদু-টোনা, হিংসুক ও হাসেদের নজর লাগা এবং শয়তানের কুপ্ররোচনা থেকে পুরো পরিবারকে নিরাপদে রাখতে এই তিনটি সূরা অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
আমলের নিয়ম ও ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় এই তিনটি সূরা তিনবার করে পাঠ করতেন। সুনান আবু দাওয়াত, হাদিস ৫০৮২ (হাদিসটি সহীহ, আল-বানি)-তে বর্ণিত হয়েছে, সকাল-সন্ধ্যায় এই সূরাগুলো পাঠ করলে তা সব ধরনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট হয়। এ ছাড়া রাতে ঘুমানোর আগে এই সূরাগুলো পড়ে নিজের দুই হাতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে মাসেহ করা সুন্নাত।
৩. সকাল-সন্ধ্যার বিশেষ সুরক্ষার দোয়া
হাদিসে বর্ণিত এই দোয়াটি পাঠ করলে আসমান ও জমিনের কোনো সৃষ্টিই দোয়াকারীর কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মা‘আসমিহী শাইউন ফিল আরদ্বি ওয়ালা ফিসসামা-ই ওয়া হুওআস সামী‘উল ‘ালীম।
অনুবাদ: আল্লাহর নামে, যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই কোনো ক্ষতি করতে পারে না, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
আমলের নিয়ম ও ফজিলত: জামে আত-তিরমিযী, হাদিস ৩৩৮৮ (হাদিসটি হাসান সহীহ) অনুসারে, যে ব্যক্তি সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার এই দোয়াটি পাঠ করবে, তাকে হঠাত্ কোনো বিপদ বা মহামারী আক্রান্ত করবে না।
৪. সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত (আয়াত ২৮৫-২৮৬)
যে ঘরে এই দুই আয়াত পাঠ করা হয়, সে ঘর থেকে শয়তান দূরীভূত হয় এবং এটি ঘরের বাসিন্দাদের মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি বৃদ্ধি করে।
আমলের নিয়ম ও ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি রাতে সূরা আল-বাকারার শেষ দুটি আয়াত পাঠ করবে, তা তার সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট হবে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস ৫MDA5)। রাতের বেলা ঘরের সকল সদস্যকে সাথে নিয়ে এটি পাঠ করার অভ্যাস করা উচিত।
৫. নেককার ও মুত্তাকী পরিবার লাভের দোয়া
পরিবারের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সন্তানদের আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতে পবিত্র কুরআনের এই দোয়াটি নিয়মিত পাঠ করা উচিত।
উচ্চারণ: রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আইয়ুনিওঁ ওয়াজ‘আলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা।
অনুবাদ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয় এবং আমাদের মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন।
উৎস: এই দোয়াটি পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪-এ বর্ণিত হয়েছে, যা একটি সুখী ও শান্তিময় ইসলামী পরিবার গঠনে অত্যন্ত কার্যকর।
পরিবার ও ঘর সুরক্ষায় সুন্নাহভিত্তিক ব্যবহারিক পদক্ষেপ
কেবল মুখে দোয়া পড়াই যথেষ্ট নয়, বরং এর পাশাপাশি ঘরের পরিবেশকে শরিয়তসম্মত রাখা এবং কিছু ব্যবহারিক আদব মেনে চলা আবশ্যক:
- বিসমিল্লাহ বলে ঘরে প্রবেশ: সহীহ মুসলিমের বর্ণনামতে, মানুষ যখন ‘বিসমিল্লাহ’ বলে ঘরে প্রবেশ করে এবং খাবার গ্রহণ করে, তখন শয়তান তার সঙ্গীদের বলে, "এখানে তোমাদের রাত্রিযাপন ও নৈশভোজের কোনো স্থান নেই।"
- নফল সালাত আদায়: ঘরে নিয়মিত নফল ও সুন্নাত সালাত আদায় করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের ঘরকে কবরস্থানের মতো ইবাদতশূন্য বানাতে নিষেধ করেছেন।
- গুনাহের কাজ বর্জন: যে ঘরে গান-বাজনা, ছবি-মূর্তি এবং নিয়মিত পর্দা লঙ্ঘন বা গুনাহের কাজ চলে, সে ঘর থেকে রহমতের ফেরেশতারা দূরে থাকেন এবং শয়তানের প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
তথ্যসূত্র
কুরআনিক আয়াত
- সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৫ — আয়াতুল কুরসি, যা শয়তানের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার প্রধান মাধ্যম।
- সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪ — আদর্শ ও নেককার পরিবার গঠনের কোরআনিক প্রার্থনা।
হাদিস
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫MDA5 — রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠের ফজিলত।
- জামে আত-তিরমিযী, হাদিস ৩৩৮৮ — সকাল-সন্ধ্যার সুরক্ষার বিশেষ দোয়া।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২০১৮ (অধ্যায়: পানীয়সমূহ) — বিসমিল্লাহ বলে ঘরে প্রবেশ ও খাবারের বরকত ও শয়তান বিতাড়ন। (দ্রষ্টব্য: সহীহ মুসলিমের নিয়মানুযায়ী এটি লিংকবিহীন রাখা হয়েছে)।

