ইসলামী জীবনব্যবস্থায় পরিবার হলো সমাজের মূল চালিকাশক্তি। একটি শান্তিময়, দ্বীনদার এবং সুসংহত পরিবার গঠনে আল্লাহর দরবারে দুআ করার গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহে পরিবারের সদস্যদের পারস্পরিক আত্মিক বন্ধন দৃঢ় করতে, তাদের শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে এবং ঘরে বরকত আনতে একাধিক শক্তিশালী দুআ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সুরক্ষায় এসব মাসনুন দুআ ও এর যথাযথ প্রয়োগ জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত আবশ্যক।
ইসলামে পারিবারিক জীবনের গুরুত্ব ও দুআর ভূমিকা
ইসলামে বৈবাহিক বন্ধন এবং পারিবারিক জীবনের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক প্রশান্তি ও দয়া। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য জোড়া সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আর-রুম, আয়াত: ২১)।
পারিবারিক শান্তি কেবল বস্তুগত উপায়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং এর জন্য আধ্যাত্মিক সুরক্ষার প্রয়োজন। আন্তরিক দুআর মাধ্যমে পরিবারে আল্লাহর রহমত নাযিল হয়, ঘরে শয়তানের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সদস্যদের মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে যায়। তবে দুআ কবুলের জন্য হালাল খাবার ও সুন্নাহসম্মত জীবনযাপন করা আবশ্যক।
নেক সন্তানের জন্য পবিত্র কুরআনের দুআসমূহ
সন্তানকে দ্বীনদার হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের জন্য পিতা-মাতার দুআ আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
১. হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর দুআ
হযরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর কাছে নেককার সন্তানের প্রার্থনা করে এই দুআটি করেছিলেন:
উচ্ছারণ: রাব্বি হাব লী মিনাস সালিহীন।
অনুবাদ: “হে আমার রব! আমাকে এক সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন।” (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০০)।
২. হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর দুআ
বংশধারা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং যোগ্য উত্তরাধিকারী লাভের আশায় হযরত যাকারিয়া (আ.) আল্লাহর দরবারে এভাবে আকুতি জানিয়েছিলেন:
উচ্ছারণ: রাব্বি লা তাযারনী ফারদান ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিছীন।
অনুবাদ: “হে আমার রব! আমাকে একা রেখো না, আর তুমিই তো সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।” (সূরা আল-আনবিয়া, আয়াত: ৮৯)।
স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও চোখের শীতলতা লাভের দুআ
দাম্পত্য কলহ দূর করতে এবং পরিবারে পরম সুখ ও চোখের শীতলতা বজায় রাখতে পবিত্র কুরআনে মুমিনদের একটি বিশেষ দুআ শেখানো হয়েছে:
উচ্ছারণ: রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইউনিউ ওয়াজ’আলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা।
অনুবাদ: “হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য ইমাম বানিয়ে দিন।” (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪)।
পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নববী দুআ
রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় নিজের এবং নিজের পরিবারের জানমাল ও ইজ্জতের হেফাযতের জন্য মহান আল্লাহর কাছে এই দুআটি পাঠ করতেন। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সুরক্ষাকবচ:
উচ্ছারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াতা ফিদ্দুনয়া ওয়াল আখিরাহ। আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াতা ফী দ্বীনি ওয়া দুনয়ায়া ওয়া আহলী ওয়া মালী।
অনুবাদ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আমার দ্বীন, আমার দুনিয়া, আমার পরিবার ও আমার সম্পদের ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৭৪; আল-আলবানী একে সহীহ বলেছেন)।
পরিবারের জন্য দুআ করার ক্ষেত্রে সাধারণ ভুলসমূহ
অনেকে দুআ করার সময় অসচেতনতাবশত কিছু ভুলত্রুটি করেন, যার কারণে দুআ কবুল হতে বিলম্ব হয়। প্রথমত, দুআ কবুলের জন্য তাড়াহুড়ো করা এবং ‘এত দুআ করলাম তাও কবুল হলো না’ বলে হাল ছেড়ে দেওয়া। হাদীস অনুযায়ী, বান্দা তাড়াহুড়ো না করা পর্যন্ত তার দুআ কবুল করা হয় (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০২)।
দ্বিতীয়ত, পরিবারে কোনো বিরোধ দেখা দিলে শরিয়তসম্মত পন্থায় তা সমাধান এবং দুআ করার পরিবর্তে বিভিন্ন ভণ্ড পীর, কবিরাজ বা জাদুটোনার আশ্রয় নেওয়া, যা সম্পূর্ণ শিরক ও হারাম কাজ। তৃতীয়ত, পরিবারের জন্য দুআ করার পাশাপাশি নিজেরা ঘরের ভেতর শরীয়তবিরোধী এবং গুনাহের পরিবেশ বজায় রাখা। গুনাহের কারণে ঘর থেকে রহমতের ফেরেশতারা চলে যান এবং বরকত উঠে যায়।
রেফারেন্স (References)
কুরআনের আয়াত (Quranic Ayahs)
- সূরা আর-রুম, ৩০:২১ — দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবনের মূল উদ্দেশ্য পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া।
- সূরা আস-সাফফাত, ৩৭:১০০ — হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর নেক সন্তান লাভের দুআ।
- সূরা আল-আনবিয়া, ২১:৮৯ — হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর যোগ্য উত্তরাধিকারী কামনার প্রার্থনা।
- সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪ — পরিবারে চোখের শীতলতা ও নেক নেতৃত্ব অর্জনের দুআ।
হাদিস (Hadith)
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৭৪ (তাহকীক: সহীহ) — সকাল-সন্ধ্যায় পরিবার ও সম্পদের সুরক্ষায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিয়মিত দুআ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০২ — অধৈর্য বা তাড়াহুড়ো না করার শর্তে দুআ কবুল হওয়ার বিবরণ (unlinked)।

