লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত হলো ইসলামে বছরের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় রাত। মহান আল্লাহ তাআলা এই রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি এটি (কোরআন) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” (সূরা আল-কদর, ৯৭:১-৩)। এই রাতে আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত এবং বান্দার পাপমোচনের এক অনন্য সুযোগ তৈরি হয়।
পবিত্র কদরের রাতে আল্লাহর দরবারে বান্দার আকুল আবেদন ও দুআ বিশেষভাবে কবুল হয়। তবে এই রাতে ইবাদত ও দুআ করার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর শেখানো সুন্নাহ পদ্ধতি অনুসরণ করা আবশ্যক। এই নিবন্ধে আমরা লাইলাতুল কদরের প্রধান দুআ, এর গভীর অর্থ, আমলের সর্বোত্তম সময় এবং দোয়ার সঠিক আদব নিয়ে সহীহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করব।
লাইলাতুল কদরের মূল সুন্নাহসম্মত দুআ
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমি যদি জানতে পারি যে কোন রাতটি লাইলাতুল কদর, তবে আমি সে রাতে কী বলব?” রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে এই দুআটি পড়ার নির্দেশ দেন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউউন, তুহিব্বুল ‘আফওয়া, ফাফু ‘আন্নী।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করা পছন্দ করেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।
এই হাদিসটি সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস ৩৫১৩ এবং সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৮৫০-এ বর্ণিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযী ও আল্লামা আল-আলবানী এই হাদিসটিকে সহীহ (বিশুদ্ধ) বলে আখ্যায়িত করেছেন। কদরের রাতে এই দুআটি বারবার পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
লাইলাতুল কদরে পড়ার মতো অন্যান্য কোরআনিক দুআ
প্রধান দুআটির পাশাপাশি পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ক্ষমার আয়াতগুলো এই রাতে বেশি বেশি তিলাওয়াত করা এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উত্তম। নিচে তেমনই দুটি গুরুত্বপূর্ণ কোরআনিক দুআ উল্লেখ করা হলো:
১. দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দুআ
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াক্বিনা ‘আজাবান্নার।
অনুবাদ: হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।
এই দুআটি কোরআনের অন্যতম ব্যাপক অর্থবোধক দুআ, যা মুমিনের সামগ্রিক জীবনের কল্যাণ নিশ্চিত করে। (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২০১)।
২. পিতা-মাতা ও নিজের জন্য ক্ষমার দুআ
উচ্চারণ: রাব্বানাগফিরলী ওয়ালিওয়ালিদাইয়া ওয়ালিলমু’মিনীনা ইয়াওমা ইয়াকূমুল হিসাব।
অনুবাদ: হে আমাদের রব! যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন।
এই বরকতময় রাতে নিজের সাথে সাথে পিতা-মাতা ও মুসলিম উম্মাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। (সূরা ইব্রাহিম, ১৪:৪১)।
লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের সর্বোত্তম সময়
ইসলামী শরিয়তে লাইলাতুল কদরের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি, যাতে বান্দা পুরো শেষ দশক ইবাদতে মগ্ন থাকে। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, “তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।” (সহীহ বুখারী, হাদিস ২০১৭)।
বিশেষ করে রমজানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তম রাতগুলোতে কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। ওলামায়ে কেরামের মতে, ২৭তম রাতে কদর হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হলেও, সুন্নাহর দাবি হলো শেষ দশকের প্রতিটি বেজোড় রাতেই সমান গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত ও দুআ করা। রাতের শেষ তৃতীয়াংশে (তাহাজ্জুদের সময়) দোয়া কবুলের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে, তবে সূর্যাস্ত থেকে ফজর পর্যন্ত পুরো রাতই দুআ করার উপযুক্ত সময়।
লাইলাতুল কদরে দুআ করার সঠিক আদব
দোয়া যেন আল্লাহর দরবারে কবুল হয়, সেজন্য কিছু সুন্নাহসম্মত আদব বা নিয়ম মেনে চলা উচিত:
- আন্তরিকতা ও একাগ্রতা: দোয়ার সময় মনকে অন্য সব দিক থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট করতে হবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “আল্লাহ কোনো উদাসীন হৃদয়ের দোয়া কবুল করেন না।” (সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস ৩৪৭৯)।
- পাপ ও হারাম থেকে দূরে থাকা: দোয়া কবুলের অন্যতম শর্ত হলো হালাল খাবার ও উপার্জন। এছাড়া অন্যায় কোনো বিষয় বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়া করা যাবে না।
- আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ শরীফ: দুআ শুরু করার সময় প্রথমে আল্লাহর হামদ বা প্রশংসা করতে হবে, এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ওপর দরুদ পাঠ করে নিজের আকুতি পেশ করতে হবে।
প্রামাণ্য সূত্র (References)
কোরআনের আয়াত (Quranic Ayahs)
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:২০১ — ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সর্বাধিক পঠিত দুআ।
- সূরা ইব্রাহিম, ১৪:৪১ — পিতামাতা ও মুমিনদের জন্য হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ক্ষমার আবেদন।
- সূরা আল-কদর, ৯৭:১-৫ — লাইলাতুল কদরের শ্রেষ্ঠত্ব ও হাজার মাসের চেয়ে উত্তম হওয়ার ঐশী ঘোষণা।
হাদিস (Hadith)
- সহীহ বুখারী, হাদিস ২০১৭ (অধ্যায়: লাইলাতুল কদরের ফজিলত) — রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে কদর তালাশ করার নির্দেশ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ১১৬৫ (অধ্যায়: সিয়াম) — রমজানের শেষ দশ দিনে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ইবাদতে কঠোর পরিশ্রমের বিবরণ।
- সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস ৩৫column৩ (অধ্যায়: দোয়া) — হযরত আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক শেখানো কদরের রাতের বিশেষ দুআ।
- সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৮৫০ (অধ্যায়: দোয়া) — আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন দোয়ার বিশুদ্ধ বর্ণনা ও রেওয়ায়েত।

