নজর লাগা বা কুদৃষ্টি (Evil Eye) একটি ধ্রুব সত্য, যা শরীআতের অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত। অনেক সময় মানুষ অজান্তেই অন্যের ভালো কিছু দেখে ঈর্ষা বা অতি-বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকায়, যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্য, সম্পদ বা পরিবারে আকস্মিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। ইসলাম এটিকে কেবল একটি কুসংস্কার মনে করে না, বরং এর বাস্তব অস্তিত্বকে স্বীকার করে এবং তা থেকে সুরক্ষার জন্য চমৎকার আত্মিক প্রতিষেধক ও চিকিৎসাপদ্ধতি বাতলে দিয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা নজর লাগার প্রভাব, তা থেকে বাঁচার সহীহ দুআসমূহ এবং কুরআন ও সুন্নাহ সম্মত বৈধ রুকইয়াহর নিয়মাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ইসলামে নজর লাগার বাস্তবতা ও গুরুত্ব
পবিত্র হাদীস শরীফে কুদৃষ্টির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অত্যন্ত জোরালো সতর্কতা এসেছে। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, “নজর লাগা সত্য।” তবে একজন মুমিনের আকীদা হতে হবে এই যে, নজর লাগা নিজস্ব কোনো ক্ষমতায় ক্ষতি সাধন করে না, বরং সবকিছুই আল্লাহর মহাবিশ্বজনীন ইচ্ছা ও তাকদীরের ফায়সালা অনুযায়ী ঘটে থাকে। তাই কুদৃষ্টির ক্ষতি থেকে বাঁচতে কোনো প্রকার কুসংস্কার, তাবিজ বা অবৈধ পন্থার আশ্রয় না নিয়ে একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং সুন্নাহ নির্দেশিত দুআসমূহ নিয়মিত পাঠ করা আবশ্যক। এটি একই সাথে একটি চমৎকার ইবাদত এবং সুরক্ষার ঢাল।
নজর থেকে বাঁচার সহীহ দুআ ও সূরাসমূহ
কুদৃষ্টি ও হিংসার অপপ্রভাব থেকে নিজেকে ও পরিবারকে নিরাপদ রাখতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বেশ কিছু সূরা ও দুআ নিয়মিত পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। নিচে তার একটি সুবিন্যস্ত গাইড দেওয়া হলো:
১. মুআব্বিযাতাঈন (সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস)
নজর এবং জাদুর প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকরী মাধ্যম হলো কুরআনের শেষ দুটি সূরা। নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যায় এবং রাতে ঘুমানোর আগে এই সূরা দুটি তিনবার করে পাঠ করা সুন্নাহ।
সূরা আল-ফালাক
উচ্চারণ: কুল আ‘উযু বিরাব্বিল ফালাক। মিন শাররি মা খালাক। ওয়া মিন শাররি গাসিকিন ইযা ওয়াকাব। ওয়া মিন শাররিন নাফফাসাতি ফিল ‘উকাদ। ওয়া মিন শাররি হাসিদিন ইযা হাসাদ।
অনুবাদ: বলুন, আমি আশ্রয় চাই প্রভাতের রবের। তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে। আর অন্ধকার রাতের অনিষ্ট থেকে যখন তা গভীর হয়। আর গিরায় ফুঁৎকারদানকারী নারীদের অনিষ্ট থেকে। এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে। (সূরা আল-ফালাক, আয়াত ১-৫)
সূরা আন-নাস
উচ্চারণ: কুল আ‘উযু বিরাব্বিন নাস। মালিকিন নাস। ইলাহিন নাস। মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খন্নাস। আল্লাযী ইউওয়াসউইসু ফী সুদূরিন নাস। মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস।
অনুবাদ: বলুন, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রবের, মানুষের অধিপতির, মানুষের ইলাহের—কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে আত্মগোপন করে। যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে। (সূরা আন-নাস, আয়াত ১-৬)
২. আয়াতুল কুরসী (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২৫৫)
পবিত্র কুরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত হলো আয়াতুল কুরসী। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, রাতে ঘুমানোর আগে এটি পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সুরক্ষাকারী ফেরেশতা নিয়োজিত থাকে এবং শয়তান তার কাছে ঘেঁষতে পারে না।
উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইলা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম। লা তা’খুযুহু সিনাতুওঁ ওয়ালা নাওম। লাহু মা ফিসসামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ। মান যাল্লাযী ইয়াশফাউ ‘ইন্দাহু ইল্লা বিইযনিহ। ইয়া’লামু মা বাইনা আইদীহিম ওয়ামা খালফাহুম। ওয়ালা ইউহীতূনা বিশাইইম মিন ‘ইলমিহী ইল্লা বিমা শা-আ। ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ, ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা, ওয়া হুওয়াল ‘আলিয়্যুল ‘আযীম।
অনুবাদ: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। আসমানসমূহে যা রয়েছে এবং জমিনে যা আছে সব তাঁরই। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। আর তাঁর ইচ্ছার বাইরে তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর কুরসী আসমানসমূহ ও জমিনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দুটির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। আর তিনি সর্বোচ্চ, মহান। (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২৫৫)
৩. আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা
উচ্চারণ: আ‘উযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক।
অনুবাদ: আমি আল্লাহর নিখুঁত কালেমাসমূহের অসিলায় তাঁর সৃষ্টির যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।
গুরুত্ব: সহীহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, বিশেষ করে কোনো নতুন স্থানে অবতরণ করলে বা বিকেল-সন্ধ্যায় এই দুআটি ৩ বার পাঠ করলে কোনো বিষাক্ত প্রাণী কিংবা ক্ষতিকারক দৃষ্টি বান্দার কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
সুন্নাহ সম্মত রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁকের সঠিক পদ্ধতি
নজর লাগার কারণে যদি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে বা কোনো শিশু অনবরত কাঁদতে থাকে, তবে সুন্নাহ সম্মত উপায়ে রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁক করা একটি বৈধ ও অত্যন্ত কার্যকরী আত্মিক চিকিৎসা। এর পদ্ধতিগুলো নিম্নরূপ:
- হাতে ফুঁ দিয়ে শরীর মোছা: দুই হাত একত্র করে সূরা আল-ইখলাস, সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে হাত বুলিয়ে দেওয়া। এটি নিয়মিত করা সুন্নাহ।
- আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর সরাসরি ফুঁ দেওয়া: কুরআন ও হাদীসের বিশুদ্ধ দুআসমূহ পড়ে সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তির কপালে বা আক্রান্ত স্থানে ফুঁ দেওয়া।
- পানি বা গোসলের মাধ্যমে চিকিৎসা: হাদীস শরীফে এসেছে, যার নজর লেগেছে তাকে যদি শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তবে তাকে ওযূ বা গোসল করতে বলা হবে এবং সেই ওযূ-গোসলের ব্যবহৃত পানি আক্রান্ত ব্যক্তির মাথায় পেছন দিক থেকে ঢেলে দিলে আল্লাহর রহমতে নজর লাগার প্রভাব তৎক্ষণাৎ দূর হয়ে যায়।
কড়া সতর্কতা: রুকইয়াহ করার সময় কেবল আল্লাহ তাআলার কালাম এবং সুন্নাহ সমর্থিত দুআই ব্যবহার করতে হবে। অর্থহীন বা অস্পষ্ট কোনো শব্দ, সাংকেতিক চিহ্ন, তাবিজে লেখা কোনো নকশা অথবা কোনো গণক-কবিরাজের কুফরী বাক্য ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম ও শিরক। এছাড়া গভীর কোনো শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে রুকইয়াহর পাশাপাশি সমসাময়িক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও সুন্নাহর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রেফারেন্স
কুরআন
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৫৫ — আয়াতুল কুরসীর মাধ্যমে শয়তান ও অনিষ্ট থেকে সার্বক্ষণিক সুরক্ষা।
- সূরা আল-ফালাক, ১১৩:১-৫ — হিংসুক ও জাদুকরের অনিষ্ট থেকে বাঁচার নির্দেশ।
- সূরা আন-নাস, ১১৪:১-৬ — মানব ও জিন শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্তি।
হাদিস
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৭ND — নজর লাগার বাস্তবতা এবং এর ক্ষতিকারক প্রভাবের সত্যতা।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৮ — কুদৃষ্টি বা নজর লাগা সত্য হওয়ার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৭০৯ — আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর সাহায্যে সকাল-সন্ধ্যায় ক্ষতিকর সৃষ্টি থেকে আশ্রয় লাভ।

