আযান ইসলামের অন্যতম প্রধান ও প্রকাশ্য একটি شعائر বা মহান নিদর্শন। প্রতিদিন পাঁচবার মুআজ্জিনের সুমিষ্ট কণ্ঠে তাওহিদ ও রিসালাতের যে ঘোষণা বাতাসে ভেসে আসে, তা কেবল সালাতের একটি সাধারণ আহ্বানই নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক আবহ ও অফুরন্ত সওয়াব। পবিত্র কুরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহীহ সুন্নাহর পাতায় আযানের শব্দাবলি, মুআজ্জিনের পদমর্যাদা এবং আযান শ্রবণকারীর জন্য অসংখ্য ইহকালীন ও পরকালীন ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। আজকের নিবন্ধে আমরা বিশুদ্ধ হাদিসের কষ্টিপাথরে প্রমাণিত আযানের ১০টি বিশেষ ফজিলত ও তার শর্তাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আযানের ১০টি সুনির্দিষ্ট ফজিলত ও মর্যাদা
১. শয়তানের চরম পরাভব ও পলায়ন
আযানের পবিত্র বাণী এতই শক্তিশালী যে, এর ধ্বনি শোনার সাথে সাথে শয়তান চরম ভীত ও অপমানিত হয়ে পলায়ন করে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন সালাতের জন্য আযান দেওয়া হয়, তখন শয়তান সশব্দে বায়ু নিঃসরণ করতে করতে পলায়ন করে, যাতে সে আযানের শব্দ শুনতে না পায়। এই অকাট্য সত্যটি বর্ণিত হয়েছে সহীহ বুখারী, হাদিস ৬০৮ এবং সহীহ মুসলিমে।
২. জিন ও মানবসহ সৃষ্টিজগতের সাক্ষ্য লাভ
মুআজ্জিনের আযানের আওয়াজ যতদূর পর্যন্ত পৌঁছায়, শেষ বিচারের দিনে ততদূরের সমস্ত সৃষ্টি তার পক্ষে আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য দেবে। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, তুমি যখন মাঠে বা ছাগলের পালে থাকবে এবং সালাতের আযান দেবে, তখন উচ্চকণ্ঠে তা দেবে। কারণ, মুআজ্জিনের আযানের আওয়াজ যতদূর পর্যন্ত পৌঁছায়, তার শ্রবণকারী জিন, মানুষ বা যেকোনো বস্তুই কিয়ামতের দিন তার জন্য সাক্ষ্য দেবে। এই নির্দেশনাটি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রমাণিত, যা আমরা জানতে পারি সহীহ বুখারী, হাদিস ৬০৯ থেকে।
৩. আযানের নিখুঁত জবাবে জান্নাত লাভ
আযান কেবল মুআজ্জিনের একা পড়ার বিষয় নয়, বরং শ্রোতার জন্যও এতে রয়েছে জান্নাত অর্জনের মহাসুযোগ। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুআজ্জিনের প্রতিটি বাক্যের জবাবে ঠিক সেই বাক্যগুলোই (এবং হাইয়া আলা... এর জবাবে লা হাওলা...) অন্তর থেকে বলতে বলেছেন। আর আযানের জবাব এভাবে যথাযথভাবে পূর্ণ করার পুরস্কার হিসেবে জান্নাত প্রাপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৫-এ স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
৪. কিয়ামতের দিন শাফায়াত বা সুপারিশ লাভ
আযান শেষ হওয়ার পর অত্যন্ত বিনম্রতার সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা এবং এর সুনির্দিষ্ট মাসনুন দুআটি পাঠ করার মাধ্যমে কিয়ামতের কঠিন বিপদের দিন রাসুল (সা.)-এর শাফায়াত লাভ করা সম্ভব হয়। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, আযান শোনার পর যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট অসিলা ও মাকামে মাহমুদের দুআটি পড়বে, কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফায়াত আবশ্যক হয়ে যাবে। দলিল: সহীহ বুখারী, হাদিস ৬১৪।
৫. মুআজ্জিনের জন্য গুনাহের মার্জনা ও ক্ষমা
আযানের শব্দ তরঙ্গের বিস্তৃতির সাথে সাথে মুআজ্জিনের ক্ষমার পরিধিও বৃদ্ধি পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুআজ্জিনের আওয়াজ যতদূর পর্যন্ত পৌঁছায়, সেই পরিমাণ তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় এবং শুষ্ক ও আর্দ্র যা কিছু তার আযান শোনে, সবাই তার ক্ষমার জন্য সুপারিশ করে। এই ফজিলতপূর্ণ হাদিসটি সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস ৬৪৬-এ বর্ণিত হয়েছে (মূল সনদে বিশুদ্ধ এবং আল-আলবানী কর্তৃক সহীহ সাব্যস্ত)।
৬. কিয়ামতের মাঠে মুআজ্জিনদের অনন্য উচ্চতা
হাশরের ময়দানে যেখানে সর্বস্তরের মানুষ ভয়ে ও আতঙ্কে থাকবে, সেখানে মুআজ্জিনদের এক বিশেষ ও সম্মানিত শারীরিক অবয়বে দেখা যাবে। মুআবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি: “কিয়ামতের দিন মুআজ্জিনদের ঘাড় বা মর্যাদা সব মানুষের চেয়ে দীর্ঘ ও উচ্চ হবে।” এই মর্যাদাপূর্ণ বাণীটি সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৭-এ plain text হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
৭. আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে দোয়া কবুল
আযান হওয়ার পর থেকে ফরয সালাতের ইকামত শুরু হওয়া পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়টি মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুলের এক মহাসুযোগ। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না, অতএব তোমরা এই সময়ে দোয়া করো। দলিল: সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২১২ (ইমাম আল-আলবানী কর্তৃক সহীহ graded)।
৮. কুরআনের আলোকে আল্লাহর স্মরণের মহাসম্মিলন
পবিত্র কুরআনে সরাসরি আযানের ফজিলত শব্দে শব্দে না থাকলেও, জুমার সালাতের জন্য যখন আযান দেওয়া হয়, তখন সমস্ত দুনিয়াবি ব্যস্ততা ও কেনাবেচা পরিত্যাগ করে আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
অনুবাদ: হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয় (আযান দেওয়া হয়), তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও। (সূরা আল-জুমুআহ, ৬২:৯)। এই আয়াত প্রমাণ করে আযান মানুষকে মহান আল্লাহর জিকিরের দিকে ফিরিয়ে আনার এক পবিত্র মাধ্যম।
৯. জামাতে সালাতের মাধ্যমে সওয়াবের বহুগুণ বৃদ্ধি
আযানের ডাক শুনে যারা সালাতের জন্য আল্লাহর ঘরের দিকে হেঁটে যায়, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত মূল্যবান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তির জামাতের সাথে সালাত আদায়ের সওয়াব তার ঘরে বা বাজারে একা পড়ার চেয়ে পঁচিশ গুণ বেশি বৃদ্ধি পায়, আর তা এই জন্য যে সে যখন উত্তমরূপে ওযূ করে মসজিদের দিকে রওয়ানা হয়, তার প্রতিটি কদমে একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং একটি করে গুনাহ মাফ হয়। দলিল: সহীহ বুখারী, হাদিস ৪৭৭।
১০. প্রথম কাতারে সালাত আদায় ও আযানের সওয়াব অর্জনের আকাঙ্ক্ষা
আযান দেওয়ার সওয়াব কত বেশি, তা বোঝাতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি অনন্য উপমা ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষ যদি জানত আযান দেওয়ার মধ্যে এবং প্রথম কাতারে সালাত আদায়ের মধ্যে কী পরিমাণ সওয়াব ও মর্যাদা রয়েছে, আর লটারি করা ছাড়া সেই সুযোগ পাওয়ার কোনো উপায় না থাকত, তবে তারা লটারি করতেও প্রস্তুত হতো। দলিল: সহীহ বুখারী, হাদিস ৬১৫।
তাত্ত্বিক সংশোধন ও প্রামাণ্য পর্যালোচনা
আযানের ফজিলত নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কোনো কোনো জায়গায় কিছু অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা ব্যবহার করা হয়। যেমন—'আযানের সময় কথা বললে মৃত্যু সহজ হয় না' কিংবা 'আযান ও ইকামতের মাঝে থাকলে জান্নাত নিশ্চিত ওয়াজিব হয়ে যায়' এমন সুনির্দিষ্ট শব্দবিন্যাসের কোনো সহীহ ও সরাসরি মারফু হাদিস সুনানে নাসাঈর ৬৮১ নম্বরে বা তিরমিযীর ২১৬ নম্বরে নেই। সুনানে নাসাঈর ৬৮১ নম্বর হাদিসটি মূলত সালাতের কাতার সোজা করা সংক্রান্ত। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ইসলামে কোনো ইবাদতের ফজিলত বর্ণনার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সহীহ ও হাসান স্তরের হাদিসের ওপরেই নির্ভর করা আবশ্যক এবং কোনো মনগড়া বা অতিশয়োক্তিপূর্ণ দুর্বল দাবি পরিহার করা উচিত।
তথ্যসূত্র
কুরআন
- সূরা আল-জুমুআহ, ৬২:৯ — সালাতের আহ্বানে সাড়া দেওয়া ও আল্লাহর স্মরণের নির্দেশ।
হাদিস
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৬০৮ (অধ্যায়: আযান) — আযানের শব্দে শয়তানের পলায়ন।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৬০৯ (অধ্যায়: আযান) — মুআজ্জিনের আওয়াজ শুনে সৃষ্টিজগতের সাক্ষ্য প্রদান।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৬১৪ (অধ্যায়: আযান) — আযান শেষের মাসনুন দুআ ও শাফায়াতের প্রতিশ্রুতি।
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৫ (অধ্যায়: সালাত) — আযানের বাক্যসমূহের নিখুঁত জবাবে জান্নাত লাভ।
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৭ (অধ্যায়: সালাত) — কিয়ামতের দিন মুআজ্জিনদের সুউচ্চ মর্যাদার বিবরণ।
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২১২ (অধ্যায়: সালাত) — আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী দোয়া কবুল হওয়া।
- সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস ৬৪৬ (অধ্যায়: আযান) — মুআজ্জিনের ক্ষমার পরিধি ও সওয়াবের বিবরণ।
আযান চলাকালীন সময়ে কি দুনিয়াবি কথাবার্তা বলা সম্পূর্ণ হারাম?
আযান চলাকালীন সময়ে দুনিয়াবি সাধারণ কথাবার্তা বলা সরাসরি হারাম বা কবিরা গুনাহ নয়, তবে তা সুন্নাহ পরিপন্থী এবং মাকরুহে তানজিহী। সুন্নাহসম্মত নিয়ম হলো আযানের সময় সমস্ত মনোযোগ মুআজ্জিনের শব্দের দিকে রাখা এবং মুখে ও মনে তার জবাব দেওয়া।
নারীরা কি ঘরে বসে আযানের জবাব দিলে পুরুষদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবেন?
হ্যাঁ, নারীরা যখন নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করে মুআজ্জিনের আযানের শব্দ শুনতে পান এবং সুন্নাহ মোতাবেক নিচু স্বরে তার জবাব দেন, তখন তারাও হাদিসে বর্ণিত জান্নাত লাভ ও সওয়াবের সম্পূর্ণ অধিকারী হন।
মুআজ্জিন যখন 'হাইয়া আলাস সালাহ' বলেন, তখন জবাবে কেন 'লা হাওলা...' বলতে হয়?
মুআজ্জিন যখন 'সালাতের দিকে এসো' বলে ডাকেন, তখন বান্দা নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বলে 'লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ'। এর অর্থ হলো—আল্লাহর তওফিক ও শক্তি ছাড়া আমার পক্ষে এই পুণ্যময় সালাতের ডাকে সাড়া দেওয়া বা মসজিদে যাওয়ার কোনো সামর্থ্য নেই।
আযানের পর দরুদ ও দুআ কি হাত তুলে মোনাজাতের আকারে করতে হবে?
না, আযান শেষ হওয়ার পর দরুদ শরিফ এবং মাসনুন দুআটি পড়ার জন্য হাত তুলে মোনাজাতের ভঙ্গি করার কোনো প্রমাণ সহীহ হাদিসে নেই। স্বাভাবিকভাবে হাত না তুলেই মনে মনে বা নিচু স্বরে এই দুআগুলো পড়া সুন্নাহসম্মত।

