নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) ও সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়াহ (দরূদে ইব্রাহিম) পাঠ করার পর এবং সালাম ফেরানোর আগের সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী পরিভাষায় এই সময়টিকে 'সালামের আগের দোয়া' বা তাশাহহুদ পরবর্তী মুনাজাত বলা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পবিত্র মুহূর্তে বিভিন্ন অর্থবহ ও তাকিদপূর্ণ দোয়া পাঠ করতেন এবং সাহাবিদের তা শেখাতেন। এটি নামাজ কবুল হওয়ার এবং আল্লাহর নৈকট্য ও ক্ষমা লাভের অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। নিচে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত সালামের আগের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও এর সঠিক নিয়ম বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
তাশাহহুদ ও দরূদের পর দোয়া পড়ার গুরুত্ব ও শরিয়তের বিধান
নামাজে সালাম ফেরানোর আগের এই সময়টি দোয়া কবুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মোক্ষম সময়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাকে তাশাহহুদ শিক্ষা দিলেন, তখন বললেন, “এরপর সে (নামাজি ব্যক্তি) নিজের পছন্দমতো যেকোনো দোয়া বেছে নিয়ে তা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে পারে।” সহীহ বুখারী, হাদিস ৮৩৫। সুতরাং, ফরজ কিংবা নফল সব নামাজেই শেষ বৈঠকে সালামের আগে কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি সুন্নত।
সালামের আগে পড়ার ৪টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহিহ দোয়া
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজে সালামের আগে নির্দিষ্ট কিছু দোয়া নিয়মিত পাঠ করতেন। নিম্নে বিশুদ্ধতম হাদিস গ্রন্থ থেকে সংকলিত ৪টি দোয়া উল্লেখ করা হলো:
১. চার ফিতনা থেকে আশ্রয় লাভের দোয়া (দোয়া মাসূরা)
নবী করিম (সা.) এই দোয়াটি পাঠ করার জন্য বিশেষ তাকিদ দিয়েছেন। শেষ বৈঠকে এই দোয়াটি পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিন আজাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন আজাবিল কবর, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত, ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসীহিদ দাজ্জাল।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই জাহান্নামের আজাব থেকে, কবরের আজাব থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং মসীহ দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে। (সহীহ মুসলিম, হাদিস ৫৮৮)
২. গুনাহ খাতার মার্জনা ও পরম ক্ষমার দোয়া
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নামাজে পড়ার মতো একটি দোয়ার আবেদন করলে নবীজি (সা.) তাঁকে এই বিখ্যাত দোয়াটি শিক্ষা দেন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি জলামতু নাফসি জুলমান কাসীরাওঁ ওয়া লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা, ফাগফির লী মাগফিরাতাম মিন ইনদিকা ওয়ারহামনী, ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহীম।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি নিজের ওপর অনেক বড় জুলুম করেছি, আর আপনি ছাড়া গুনাহসমূহ ক্ষমা করার কেউ নেই। অতএব, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে বিশেষ ক্ষমা দান করুন এবং আমার প্রতি দয়া করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু। সহীহ বুখারী, হাদিস ৮৩৪
৩. ইহকাল ও পরকালের সর্বাত্মক কল্যাণের দোয়া (কুরআনিক দোয়া)
কুরআন মাজিদের এই প্রসিদ্ধ আয়াতটি রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের ভেতরে ও বাইরে অধিকাংশ সময় পাঠ করতেন। শেষ বৈঠকেও এটি পড়া অত্যন্ত পুণ্যময়।
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া কিনা আজাবান নার।
অনুবাদ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ইহকালে কল্যাণ দান করুন এবং পরকালেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের দোজনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। সূরা আল-বাকারা, ২:২০১
৪. আগের ও পরের সমস্ত গুনাহ মাফের দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) শেষ বৈঠকে সালামের আগে নিজের বিনয় প্রকাশার্থে এবং উম্মতের শিক্ষার জন্য এই দোয়াটি মাঝেমধ্যে পাঠ করতেন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লী মা কাদ্দামতু ওয়া মা আখখারতু, ওয়া মা আসরারতু ওয়া মা আ'লানতু, ওয়া মা আসরাফতু ওয়া মা আনতা আ'লামু বিহি মিন্নী। আনতাল মুকাদ্দিমু ওয়া আনতাল মুআখখিরু লা ইলাহা ইল্লা আনতা।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আপনি আমার অতীত ও ভবিষ্যতের, গোপন ও প্রকাশ্য এবং আমার সীমালঙ্ঘনের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দিন; যা আমার চেয়ে আপনি ভালো জানেন। আপনিই অগ্রগামী করেন এবং আপনিই পশ্চাৎগামী করেন, আপনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। (সহীহ মুসলিম, হাদিস ৭৭১)
নামাজে সালামের আগে দোয়া করার সঠিক নিয়ম ও আদব
তাশাহহুদ পরবর্তী দোয়া আদায়ের ক্ষেত্রে নামাজের সুনির্দিষ্ট কিছু আদব রয়েছে, যা বজায় রাখা জরুরি:
- ধারাবাহিকতা রক্ষা: শেষ বৈঠকে প্রথমে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) শেষ করতে হবে, তারপর সালাওয়াত ইব্রাহিমিয়াহ (দরূদ) পড়তে হবে। এই দুই আমল শেষ করার পরই কেবল উপরের সহিহ দোয়াগুলো পড়তে হবে।
- হাত না তোলা: নামাজের ভেতরের এই দোয়াটি সাধারণ মুনাজাতের মতো হাত তুলে করা সুন্নাহসম্মত নয়। শেষ বৈঠকের স্বাভাবিক বসার ভঙ্গিতে হাত উরুর ওপর রেখেই মনে মনে ও মৃদু আওয়াজে (যে নিজের কানে পৌঁছায়) এই দোয়া পাঠ করতে হবে।
- একাধিক দোয়া পাঠ: বিশেষ করে নফল, তাহাজ্জুদ বা সুন্নত নামাজে চাইলে এক বা একাধিক সহিহ দোয়া পরপর সংযুক্ত করে পড়া সম্পূর্ণ জায়েজ ও সওয়াবের কাজ।
দোয়া মাসূরা আদায়ের ক্ষেত্রে সাধারণ কিছু ভুল
মুসল্লিদের মাঝে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ও কর্ম নিচে তুলে ধরা হলো যা পরিহার করা উচিত:
- আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় দোয়া করা: ফরজ নামাজের ভেতর শেষ বৈঠকে নিজের ভাষায় বা বাংলা ভাষায় দুনিয়াবি বিষয়ে মনগড়া দোয়া করা অধিকাংশ ফকীহের মতে জায়েজ নয়। নামাজে কেবল কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত আরবি শব্দমালার দোয়াগুলোই পাঠ করা কর্তব্য।
- ভুল সময়ে দোয়া পড়া: অনেকে তাশাহহুদ পড়ার আগেই তাড়াহুড়ো করে দোয়া মাসূরা পড়ে ফেলেন। এটি নিয়মের পরিপন্থী। সর্বদা দরূদ শরীফ পাঠের পরেই দোয়ার স্থান।
References
Quranic Ayahs
- সূরা আল-বাকারা, ২:২০১ — দুনিয়া ও আখিরাতের সামগ্রিক কল্যাণের কুরআনিক দোয়া।
Hadith
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৮৩৫ (অধ্যায়: আজান) — তাশাহহুদের পর নামাজে নিজের পছন্দমতো দোয়া করার সুন্নাহর দলিল।
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৮৩৪ — হযরত আবু বকর (রা.)-কে আল্লাহর রাসুল (সা.) কর্তৃক শেখানো দোয়া মাসূরার বিবরণ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৫৮৮ — চার ফিতনা (জাহান্নাম, কবর, জীবন-মৃত্যু ও দাজ্জাল) থেকে মুক্তি চাওয়ার নির্দেশ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৭৭১ — সালামের পূর্বে নবী করিম (সা.) এর পাপ মোচনের দীর্ঘ দোয়ার বিবরণ।

