সালাত বা নামাজ হলো মুমিনের মিরাজ এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। সালাতের প্রতিটি রুকন ও নড়াচড়ার পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। এর মধ্যে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়শই অবহেলিত সময় হলো—দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠক বা বসার সময়। প্রথম সিজদা শেষ করে দ্বিতীয় সিজদায় যাওয়ার আগে সোজা হয়ে বসার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন। এই দোয়াগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও বহুল প্রচলিত দোয়াটি হলো 'রাব্বিগফিরলি'। নিচে এই দোয়ার সহিহ হাদিসের প্রমাণ, বিশুদ্ধ উচ্চারণ, অর্থ ও আমলের নিয়মাবলী বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
দুই সিজদার মাঝে বসার গুরুত্ব ও বিধান
নামাজে প্রথম সিজদা থেকে মাথা উঠিয়ে সোজা হয়ে স্থিরভাবে বসা সালাতের অন্যতম একটি ওয়াজিব বিধান (কোনো কোনো ফকীহের মতে এটি ফরজ বা রুকন)। এই বৈঠককে আরবিতে 'জলসা' বলা হয়। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সোজা হয়ে না বসেই দ্বিতীয় সিজদায় চলে যাওয়া একটি বড় ভুল, যা সালাতকে ত্রুটিযুক্ত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মধ্যবর্তী বৈঠকে স্থিরতা অবলম্বন করতেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে দোয়া পাঠ করতেন।
দোয়া রাব্বিগফিরলি: আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
দুই সিজদার মাঝে পড়ার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে একাধিক দোয়া প্রমাণিত রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত এবং সহজে আমলযোগ্য দোয়াটি নিচে দেওয়া হলো:
উচ্চারণ: রাব্বিগফিরলি, রাব্বিগফিরলি।
অনুবাদ: হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন। হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করুন।
হাদিসের সূত্র: হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠকে বলতেন—‘রাব্বিগফিরলি, রাব্বিগফিরলি’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৮৯৭)। ইমাম আল-অ্যালবানি হাদিসটিকে সহিহ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
দুই সিজদার মাঝে পড়ার দীর্ঘতর সহিহ দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে দুই সিজদার মাঝে পড়ার জন্য আরও একটি দীর্ঘতর ও ব্যাপক অর্থবোধক দোয়া বর্ণিত হয়েছে। যে ব্যক্তি সালাতে আরও বেশি গভীরতা ও কল্যাণ কামনা করেন, তিনি এটি পাঠ করতে পারেন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলী ওয়ারহামনী ওয়াজবুরনী ওয়াহদিনী ওয়ারযুকনী।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দিন, আমাকে হেদায়েত দান করুন এবং আমাকে রিজিক দান করুন।
হাদিসের সূত্র: আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই সিজদার মাঝখানে এই দোয়াটি পড়তেন (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৮৫০)।
দোয়াটির তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও গুরুত্ব
এই দোয়ার শব্দগুলো অত্যন্ত অর্থবহ। 'রব' শব্দের অর্থ যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং লালন-পালন করছেন। আর 'ইগফির' শব্দের উৎপত্তি 'গফর' থেকে, যার অর্থ কোনো কিছু ঢেকে রাখা বা রক্ষা করা। বান্দা যখন দুই সিজদার মাঝখানে বসে বলে 'আমাকে ক্ষমা করুন', তখন সে মূলত আল্লাহর কাছে আবেদন জানায় যেন আল্লাহ তার গুনাহগুলো ঢেকে দেন, দুনিয়া ও আখেরাতে তাকে লজ্জিত না করেন এবং গুনাহের অশুভ প্রতিক্রিয়া থেকে তাকে রক্ষা করেন। দুই সিজদার মতো দুটি চরম বিনয়ের অবস্থানের মাঝখানে এই আরজি পেশ করা দোয়া কবুলের সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
দুই সিজদার মাঝে বসার সঠিক পদ্ধতি (সুন্নত আদব)
সালাতে দুই সিজদার মাঝে বসার একটি নির্দিষ্ট সুন্নাহ সম্মত তরিকা রয়েছে, যা খুশু-খুজু বাড়াতে সাহায্য করে:
- প্রথম সিজদা থেকে মাথা তোলার সময় 'আল্লাহু আকবার' বলতে বলতে সোজা হয়ে বসবেন।
- পুরুষদের জন্য বসার সুন্নাহ নিয়ম হলো—বাম পা বিছিয়ে তার ওপর বসতে হবে এবং ডান পা খাড়া রেখে পায়ের আঙুলগুলো কিবলার দিকে বাঁকা করে রাখতে হবে। ফিকহের পরিভাষায় একে 'ইফতিরাশ' বলা হয়।
- নারীদের বসার ক্ষেত্রে হানাফী ফিকহ অনুযায়ী সুন্নাহ হলো—উভয় পা ডান দিকে বের করে দিয়ে নিতম্বের ওপর বসতে হবে, যাকে 'তাওয়াররুক' বলা হয়।
- বসা অবস্থায় দুই হাত দুই হাঁটুর ওপর স্বাভাবিকভাবে রাখতে হবে। হাতের আঙুলগুলো কিবলার দিকে সোজা থাকবে এবং ছড়ানো থাকবে না।
- সোজা হয়ে বসার পর শরীর সম্পূর্ণ স্থির হলে তবেই দোয়া পাঠ করবেন। দোয়া শেষ করে 'আল্লাহু আকবার' বলতে বলতে দ্বিতীয় সিজদায় অবনত হবেন।
আমলের ক্ষেত্রে সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা
আমাদের সমাজে নামাজ আদায়ের সময় দুই সিজদার মাঝে কিছু সাধারণ অসচেতনতা লক্ষ্য করা যায়, যা বর্জন করা উচিত:
- স্থিরতা অবলম্বন না করা (তাড়াহুড়ো): সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো—প্রথম সিজদা থেকে মাথা তুলে পুরোপুরি সোজা হয়ে বসার আগেই দ্রুত দ্বিতীয় সিজদায় চলে যাওয়া। এটি ওয়াজিব তরক করার শামিল এবং এর ফলে নামাজ বাতিলও হয়ে যেতে পারে।
- হানাফী মাজহাবে দোয়ার বিধান: হানাফী ফিকহ শাস্ত্রের মূল ফতোয়া অনুযায়ী, ফরজ নামাজে দুই সিজদার মাঝে দোয়া পড়া ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা নয়, বরং এটি মুস্তাহাব বা নফল আমল হিসেবে গণ্য। তবে নফল, সুনান ও তাহাজ্জুদের নামাজে এই দোয়া পড়ার জোর তাকিদ দেওয়া হয়েছে। তাই ফরজ নামাজে ইমামের পেছনে থাকলে ইমামের গতির দিকে খেয়াল রাখতে হবে, তবে একাকী পড়লে অবশ্যই এই সুন্নতের আমল করা উচিত।
- বাংলায় উচ্চারণ করা: নামাজের ভেতরে যেকোনো দোয়া কেবল আরবিতেই উচ্চারণ করতে হবে। বাংলা অনুবাদ মুখে উচ্চারণ করে পড়লে সালাত নষ্ট হয়ে যাবে।
উপসংহার
দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠক মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত ও মাগফিরাত প্রার্থনার এক চমৎকার সুযোগ। 'রাব্বিগফিরলি' দোয়াটি ছোট হলেও এর তাৎপর্য অপরিসীম। যান্ত্রিকভাবে নামাজ না পড়ে প্রতিবার প্রথম সিজদা থেকে উঠে সোজা হয়ে বসে এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। এটি সালাতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহর দরবারে বান্দার বিনয়কে পূর্ণতা দেয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী সালাত আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
রেফারেন্স
হাদিস
- সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৮৯৭ (অধ্যায়: সালাত কায়েম করা) — দুই সিজদার মাঝে 'রাব্বিগফিরলি' পাঠের সহিহ বর্ণনা।
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৮৫০ (অধ্যায়: সালাত) — দুই সিজদার মাঝে দীর্ঘ মাসনুন দোয়ার বিবরণ।
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯৭৯ — সিজদা ও তৎসংলগ্ন সময়ে বেশি বেশি দোয়া করার সাধারণ নির্দেশ।

