ফজরের আযানে আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউমের অর্থ ও শরয়ী বিধান

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১২ জুল, ২০২৬সালাত

ইসলামের অন্যতম একটি সুন্দর ও অর্থবহ ইবাদত হলো আযান। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আযানের নির্ধারিত শব্দাবলি রয়েছে। তবে ফজরের আযানে একটি বিশেষ বাক্য অতিরিক্ত যোগ করা হয়, যা অন্য কোনো ওয়াক্তের আযানে বলা হয় না। বাক্যটি হলো—"আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম"। শরীয়তের পরিভাষায় একে 'তাসউইব' (تثويب) বলা হয়। এই বাক্যটি মুমিন বান্দাকে অলসতা ও ঘুমের আরাম ত্যাগ করে মহান আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হওয়ার এক অনন্য আহ্বান। বর্তমান নিবন্ধে আমরা এই মহান বাক্যের অর্থ, সুন্নাহসম্মত উৎস ও এর ফিকহী বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম: আরবি ও অর্থ

ফজরের আযানে 'হাঁইয়া আলাল ফালাহ' বলার পর মুআযযিন এই বাক্যটি দুইবার উচ্চারণ করেন। এর সঠিক রূপ নিচে দেওয়া হলো:

الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِنَ النَّوْمِ

উচ্চারণ: আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম।

অনুবাদ: ঘুম অপেক্ষা নামাজ উত্তম।

হাদিসের আলোকে এই বাক্যের সুন্নাহসম্মত উৎস

ফজরের আযানে এই বাক্যটি যুক্ত করার বিধান স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। এটি কোনো পরবর্তী মনগড়া সংযোজন নয়। আবু মাহযূরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে আযান শিক্ষা দেওয়ার সময় বলেছেন, "যদি তা ফজরের আযান হয়, তবে বলবে: আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম, আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম।" (সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস ৬৩৩)

অনেকে মনে করেন ওমর (রা.) সর্বপ্রথম এটি আযানে যুক্ত করেছিলেন, যা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। বরং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশেই মক্কা ও মদীনার মুআযযিনগণ ফজরের আযানে এটি পাঠ করতেন। ওমর (রা.) কেবল এই সুন্নাহটিকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত ও নিয়মিত করার তাগিদ দিয়েছিলেন।

প্রথম আযান বনাম দ্বিতীয় আযান: একটি সংশয় নিরসন

ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা হলো—এই বাক্যটি ফজরের কোন আযানে বলা হবে? রমজান বা সাধারণ সময়ে তাহাজ্জুদের জন্য যে প্রথম আযান দেওয়া হয়, নাকি ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর জামাতের জন্য যে আযান দেওয়া হয়? ইমাম বায়হাকী ও নাসায়ী (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, সুন্নাহ হলো ফজরের মূল আযানে (ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর) এটি বলা। ভুলবশত কেউ কেউ তাহাজ্জুদের আযানে এটি বলেন, যা ফুকাহায়ে কেরামের অধিকাংশের মতে সুন্নাহ পরিপন্থী।

এই বাক্যটি শোনার পর জবাব দেওয়ার নিয়ম

সাধারণ আযানের বাক্যগুলোর জবাবে মুআযযিনের অনুরূপ শব্দই বলতে হয়। তবে 'আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম' শোনার পর কী বলতে হবে, তা নিয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে দুটি মত রয়েছে:

  • প্রথম মত: মুআযযিনের মতো হুবহু "আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম" বলাই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও সুন্নাহসম্মত আমল। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা যখন মুআযযিনের আযান শুনবে, তখন সে যা বলে তোমরাও তা-ই বলো।" (সহীহ বুখারী, হাদিস ৬১১)। এই সাধারণ নির্দেশের মধ্যে ফজরের এই বাক্যটিও অন্তর্ভুক্ত।
  • দ্বিতীয় মত: কোনো কোনো ফকীহ "সাদাক্বতা ওয়া বারারতা" (তুমি সত্য বলেছ এবং পুণ্যময় কাজ করেছ) বলার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এই মর্মে বর্ণিত হাদিসটি সনদের দিক থেকে যয়ীফ বা দুর্বল। তাই প্রথম মতটি অনুসরণ করাই উত্তম ও নিরাপদ।

ফজরের নামাজের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব ও ফজিলত

ঘুম মানবদেহের জন্য এক পরম আরামের বিষয়, আর ফজরের সময়কার ঘুম সাধারণত গভীর হয়ে থাকে। এই গভীর ঘুম ভেঙে আল্লাহর ইবাদতে দাঁড়িয়ে যাওয়া মুমিনের আন্তরিক ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ফজরের নামাজ আদায়ের মাধ্যমে বান্দা সারাদিনের জন্য আল্লাহর প্রত্যক্ষ সুরক্ষায় প্রবেশ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করল, সে আল্লাহর জিম্মায় (নিরাপত্তায়) চলে গেল।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস ৬৫৭)

আযানের তাসউইব সম্পর্কিত সাধারণ ভুলত্রুটি

  1. দ্রুত ও ভুল উচ্চারণ করা: অনেক সময় মুআযযিনগণ সুর ঠিক রাখতে গিয়ে আরবির সঠিক মাখরাজ বা উচ্চারণ ক্ষুণ্ণ করেন, যা অনুচিত।
  2. ইকামতের সময় এই বাক্য বলা: ইকামত হলো নামাজ শুরু করার তাৎক্ষণিক সংকেত, সেখানে এই বাক্যটি বলার কোনো বিধান ইসলামে নেই। এটি কেবল আযানের জন্য সুনির্দিষ্ট।

তথ্যসূত্র

উৎস ও রেফারেন্সসমূহ

হাদিস গ্রন্থ

  • সহীহ বুখারী, হাদিস ৬১১ (অধ্যায়: আযান) — মুআযযিনের আযানের অনুরূপ জবাব দেওয়ার সাধারণ নির্দেশ।
  • সহীহ মুসলিম, হাদিস ৬৫৭ (অধ্যায়: মসজিদ ও সালাতের স্থান) — ফজরের নামাজ আদায়কারীর আল্লাহর জিম্মায় থাকার ফজিলত।
  • সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস ৬৩৩ (অধ্যায়: আযান) — ফজরের আযানে তাসউইব বা 'আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম' বলার মূল নির্দেশ।
  • সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫০০ (অধ্যায়: সালাত) — আবু মাহযূরা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক আযান শিক্ষা দেওয়া।

আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম বাক্যটি আযানে বলা কি ফরজ?

না, এটি ফরজ নয়। এটি ফজরের আযানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতে মুআক্কাদা। মুআযযিন যদি ওজরের কারণে বা ভুলে এটি বাদ দেন, তবুও আযান হয়ে যাবে, তবে সুন্নাহ তরক হবে।

তাহাজ্জুদের আযানে কি এই বাক্যটি বলা যাবে?

বিশুদ্ধ ও অধিকাংশ ফকীহদের মতানুযায়ী, এটি কেবল ফজরের ওয়াক্ত প্রবিষ্ট হওয়ার পর যে আযান দেওয়া হয়, তাতেই বলতে হবে। তাহাজ্জুদের আযানে এটি বলা সুন্নাহসম্মত নয়।

আযানের জবাবে 'সাদাক্বতা ওয়া বারারতা' বলা কি বিদআত?

এটিকে সরাসরি বিদআত বলা সমীচীন নয়, কারণ প্রাচীনকালের বহু ফকীহ এর অনুমতি দিয়েছেন। তবে যেহেতু এই সংক্রান্ত হাদিসটি দুর্বল, তাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাধারণ নির্দেশ মেনে মুআযযিনের মতো হুবহু 'আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউম' বলাই উত্তম।

উপসংহার

ফজরের আযানের এই বিশেষ ঘোষণাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নশ্বর পৃথিবীর সাময়িক আরামের চেয়ে মহান আল্লাহর নৈকট্য ও পরকালের স্থায়ী সাফল্য অনেক বেশি মূল্যবান। একজন প্রকৃত মুমিন এই মধুর আহ্বান শোনার সাথে সাথেই ঘুমের বিছানা ত্যাগ করে সালাতের দিকে ধাবিত হন। আল্লাহ তাআলা আমাদের আযানের মর্যাদা রক্ষা করার এবং সুন্নাহ মোতাবেক জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না

আস-সালাতু খাইরুম মিনান-নাউমের অর্থ ও বিধান | ফজরের আযান