বিতর নামাজ ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত। ইশার ফরজ ও সুন্নাত সালাত আদায়ের পর থেকে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত যেকোনো সময় বিতর নামাজ আদায় করা যায়। 'বিতর' শব্দের অর্থ বেজোড়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা বেজোড় সংখ্যায় এই সালাত আদায় করতেন এবং উম্মতকে তা নিয়মিত আদায়ের তাগিদ দিয়েছেন। এই নিবন্ধে সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে ধাপে ধাপে ৩ রাকাত বিতর নামাজ আদায়ের পদ্ধতি এবং দোয়া কুনুত পড়ার বিশুদ্ধ নিয়ম আলোচনা করা হলো।
বিতর নামাজ কী ও এর হুকুম
বিতর হলো রাতের শেষভাগে বা ইশার সালাতের পর আদায়যোগ্য একটি বিশেষ বেজোড় নামাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) সফর কিংবা বাড়িতে থাকা অবস্থায় কখনোই এই নামাজ ত্যাগ করেননি। জমহুর ও অধিকাংশ ওলামাদের (শাফিঈ, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব) মতে বিতর নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, যা ত্যাগের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। আর হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মতানুযায়ী বিতর নামাজ ওয়াজিব। সুতরাং কোনো মুসলিমেরই অবহেলাবশত এই গুরুত্বপূর্ণ সালাত ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
বিতর সালাতের রাকাত সংখ্যা ও সময়
সুন্নাহ অনুযায়ী বিতর নামাজ ১ রাকাত, ৩ রাকাত, ৫ রাকাত, ৭ রাকাত বা তার চেয়েও বেশি বেজোড় সংখ্যায় আদায় করা জায়েজ। তবে উম্মাহর মধ্যে ৩ রাকাত বিতর পড়ার প্রচলন সবচেয়ে বেশি। ইশার সালাত সম্পন্ন করার পর থেকে নিয়ে ফজর বা সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত বিতরের সময় বহাল থাকে। যারা শেষ রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়েন, তাদের জন্য রাতের সর্বশেষ নামাজ হিসেবে বিতরকে একদম শেষ সময়ে আদায় করা মোস্তাহাব।
ধাপে ধাপে ৩ রাকাত বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম (হানাফি পদ্ধতি)
সাধারণত আমাদের দেশে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী যেভাবে ৩ রাকাত বিতর সালাত আদায় করা হয়, তার ধারাবাহিক ধাপগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নিয়ত ও প্রথম রাকাত
কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে মনে মনে ৩ রাকাত বিতর ওয়াজিব নামাজ আদায়ের সংকল্প বা নিয়ত করুন (মুখে নিয়ত উচ্চারণ করা জরুরি নয়)। আল্লাহু আকবর বলে তাকবিরে তাহরিমা দিয়ে হাত বাঁধুন। প্রথমে ছানা পড়ুন, এরপর সূরা ফাতিহা পড়ে পবিত্র কোরআনের যেকোনো একটি সূরা (যেমন: সূরা আল-আলা) মেলান। এরপর স্বাভাবিক নামাজের মতোই রুকু ও দুটি সেজদা শেষ করে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য সোজা হয়ে দাঁড়ান।
২. দ্বিতীয় রাকাত ও প্রথম বৈঠক
দ্বিতীয় রাকাতেও স্বাভাবিকভাবে সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা (যেমন: সূরা আল-কাফিরুন) পাঠ করুন। এরপর রুকু এবং দুটি সেজদা সম্পন্ন করে প্রথম বৈঠকের জন্য বসুন। এই বৈঠকে শুধু তাশাহহুদ (আত্তাহিইয়াতু) পাঠ করবেন। তাশাহহুদ শেষ করে দুরুদ শরিফ না পড়ে সরাসরি আল্লাহু আকবর বলে তৃতীয় রাকাতের জন্য উঠে দাঁড়ান।
৩. তৃতীয় রাকাত ও দোয়া কুনুত
তৃতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে প্রথমে সূরা ফাতিহা পড়ুন এবং এরপর অন্য একটি সূরা (যেমন: সূরা ইখলাস) তিলাওয়াত করুন। কিরাত শেষ করার পর রুকুতে না গিয়ে 'আল্লাহু আকবর' বলে দুই হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে আবার নাভির নিচে বাঁধুন। হাত বাঁধার পর নিভৃতে ধীরস্থিরভাবে দোয়া কুনুত পাঠ করুন। দোয়া শেষ হলে তাকবির বলে রুকুতে যান এবং পূর্বের নিয়মে দুটি সেজদা শেষ করে শেষ বৈঠকের জন্য বসুন। শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ, দুরুদ শরিফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে ডানে ও বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ সম্পন্ন করুন।
দোয়া কুনুতের আরবি, উচ্চারণ ও অনুবাদ
হানাফি মাযহাবে হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত সুপরিচিত দোয়া কুনুতটি পড়া হয়। দোয়াটি নিচে দেওয়া হলো:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তাইনুকা ওয়া নাস্তাগফিরুকা ওয়া নু'মিনু বিকা ওয়া নাতাওয়াক্কালু আলাইকা ওয়া নুছনি আলাইকাল খাইরা ওয়া নাশকুরুকা ওয়া লা নাকফুরুকা ওয়া নাখলাউ ওয়া নাতরুকু মাই ইয়াফজুরুক। আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া লাকা নুসল্লি ওয়া নাসজুদু ওয়া ইলাইকা নাসআ ওয়া নাহফিদu নারজু রাহমাতাকা ওয়া নাখশা আজাবাকা ইন্না আজাবাকা বিল কুফফারি মুলহিক্ব।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমরা তোমারই সাহায্য চাই, তোমারই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, তোমার ওপর ঈমান রাখি, তোমার ওপর ভরসা করি এবং তোমার উত্তম প্রশংসা করি। আমরা তোমার কৃতজ্ঞতা আদায় করি, অকৃতজ্ঞ হই না। যারা তোমার নাফরমানি বা অবাধ্যতা করে, তাদের আমরা পরিত্যাগ ও বর্জন করি। হে আল্লাহ! আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি, তোমারই জন্য সালাত আদায় করি ও সিজদা করি। তোমারই দিকে আমরা ধাবিত হই এবং তোমারই সেবায় নিয়োজিত থাকি। আমরা তোমার রহমতের আশা করি ও তোমার শাস্তিকে ভয় করি। নিশ্চয়ই তোমার কঠোর শাস্তি কাফিরদের ওপর আপতিত হবে।
এছাড়াও সুন্নাহর অন্যান্য বর্ণনায় (যেমন শাফিঈ ও হাম্বলি মাযহাবে) হাসান ইবনে আলী (রা.) থেকে বর্ণিত দোয়া কুনুতটি পড়া হয়: "আল্লাহুম্মাহদিনি ফীমান হাদাইত..." (সুনানে তিরমিযী, হাদিস ৪৬৪)। যেকোনো একটি সহিহ দোয়া দিয়ে কুনুত আদায় করলেই তা শরিয়তসম্মত হবে।
উইতর নামাজে দোয়া কুনুতের আদব ও ভুলত্রুটি
দোয়া কুনুত পড়ার সময় তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি বাক্যের অর্থ অনুধাবন করে পড়া উচিত। কুনুত হলো আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও অনুনয়-বিনয় প্রকাশের মাধ্যম। অনেক সময় সাধারণ মানুষ মনে করেন সুনির্দিষ্ট এই আরবি দোয়াটি না জানলে হয়তো উইতর নামাজই হবে না—এটি একটি ভুল ধারণা। দোয়া কুনুত মুখস্থ না থাকলে অন্য যেকোনো মাসনূন দোয়া পড়ে সাময়িকভাবে ওয়াজিব আদায় করা সম্ভব, তবে সুন্নাহ সমর্থিত দোয়াটি দ্রুত শিখে নেওয়া উচিত।
References
Quranic Ayahs
- সূরা আল-বাক্বারাহ, ২:২৩৮ — সকল সালাত বা নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়ার সাধারণ নির্দেশনা।
Hadith
- सहীহ বুখারী, হাদিস ৯৯০ (অধ্যায়: উইতর) — রাতের সালাত বেজোড় করার তাগিদ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৭৪৯ (অধ্যায়: মুসাফিরের সালাত) — রাতের শেষ নামাজ বেজোড় (উইতর) করার নির্দেশ।
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৪২৫ (অধ্যায়: উইতর) — উইতর সালাত আদায়ের ফজিলত ও গুরুত্ব।
- সুনানে তিরমিযী, হাদিস ৪৬৪ (অধ্যায়: উইতর) — রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক হাসান (রা.)-কে শিখানো দোয়া কুনুত।
- সুনানে নাসায়ী, হাদিস ১৬৯৮ (অধ্যায়: ক্বিয়ামুল লাইল) — রুকুর পূর্বে কুনুত পড়ার বিবরণ।
দোয়া কুনুত মুখস্থ না থাকলে উইতর নামাজে কী পড়া যাবে?
উইতর নামাজে ভুলবশত দোয়া কুনুত ছেড়ে দিলে করণীয় কী?
উইতর নামাজ কি এক রাকাত পড়া জায়েজ?
উপসংহার
বিতর নামাজ মহান আল্লাহর ভালোবাসার একটি অনন্য নিদর্শন এবং সুন্নাহর গুরুত্বপূর্ণ আমল। এর মাধ্যমে বান্দা তার সারাদিনের ইবাদতের সমাপ্তি ঘটায়। নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধাপে ধাপে সহিহ উচ্চারণে দোয়া কুনুতসহ এই নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণ করে সহিহ পদ্ধতিতে উইতর সালাত আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমীন।

