মানবজীবনে প্রতিনিয়ত আমাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিয়ে, ব্যবসা, চাকরি কিংবা উচ্চশিক্ষার মতো বিষয়ে কোন পথটি আমাদের জন্য প্রকৃত কল্যাণকর, তা আমরা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে জানতে পারি না। এই ধরনের সিদ্ধান্তহীনতার মুহূর্তে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে সঠিক পথ বেছে নেওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের ইস্তিখারা করার শিক্ষা দিয়েছেন। 'ইস্তিখারা' শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো কোনো বিষয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা। এটি ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ, যা বান্দাকে মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি দেয় এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকতে সাহায্য করে।
ইস্তিখারা সালাত ও দুআর গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবিদেরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ইস্তিখারা করার পদ্ধতি শেখাতেন। সাহাবি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের প্রত্যেক কাজে ইস্তিখারা করার শিক্ষা দিতেন, যেভাবে তিনি আমাদের কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন। এই সুন্নাহসম্মত আমলটি করার মাধ্যমে বান্দা তার নিজের সীমাবদ্ধতা ও অজ্ঞতা স্বীকার করে আল্লাহর অসীম জ্ঞান ও শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। তবে মনে রাখতে হবে, ইস্তিখারা কোনো ভাগ্য গণনার মাধ্যম নয়, বরং এটি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনার একটি ঐকান্তিক প্রার্থনা।
ইস্তিখারা দুআ: আরবি, উচ্চারণ ও বাংলা অর্থ
ইস্তিখারার সালাত আদায়ের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এই নির্দিষ্ট প্রামাণিক দুআটি পাঠ করতে হয়। দুআটি পড়ার সময় নিজের উদ্দিষ্ট প্রয়োজনের কথা মনে মনে বা নির্দিষ্ট স্থানে উল্লেখ করতে হবে।
আরবি টেক্সট
বাংলা উচ্চারণ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আস্তাখীরুকা বি‘ইলমিকা ওয়া আস্তাক্বদিরুকা বিক্বুদরাতিকা ওয়া আসআলুকা মিন ফাদলিকাল ‘আযীম, ফাইন্নাকা তাক্বদিরু ওয়া লা আক্বদিরু ওয়া তা‘লামু ওয়া লা আ‘লামু ওয়া আনতা ‘আল্লামুল গুয়ূব। আল্লাহুম্মা ইন কুন্তা তা‘লামু আন্না হাযাল আমরা (এখানে নিজের প্রয়োজনের কথা মনে মনে ভাববেন বা মুখে বলবেন) খাইরুল লী ফী দীনী ওয়া মা‘আশী ওয়া ‘আক্বিবাতি আমরী, ফাক্বদুরহু লী ওয়া ইয়াসসিরহু লী ছুম্মা বারিক লী ফীহ। ওয়া ইন কুন্তা তা‘লামু আন্না হাযাল আমরা শাররুল লী ফী দীনী ওয়া মা‘আশী ওয়া ‘আক্বিবাতি আমরী, ফাসরিফহু ‘আন্নী ওয়াসরিফনী ‘আনহু ওয়াক্বদুর লিয়াল খাইরা হাইছু কানা ছুম্মা আরদ্বিনী বিহ।
বাংলা অনুবাদ
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি তোমার জ্ঞানের সাহায্যে তোমার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করছি এবং তোমার কুদরতের সাহায্যে শক্তি কামনা করছি এবং তোমার মহান অনুগ্রহের প্রার্থনা করছি। কেননা তুমিই ক্ষমতাবান, আমি অক্ষম। তুমিই সর্বজ্ঞ, আমি জ্ঞানহীন এবং তুমিই সমস্ত অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা। হে আল্লাহ! তুমি যদি এই কাজটি আমার দীন, আমার জীবন এবং আমার পরিণামের দিক দিয়ে কল্যাণকর মনে করো, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করে দাও এবং তা আমার জন্য সহজ করে দাও, অতঃপর তাতে আমার জন্য বরকত দাও। আর যদি তুমি এই কাজটি আমার দীন, আমার জীবন এবং আমার পরিণামের দিক দিয়ে ক্ষতিকর মনে করো, তবে তা আমার থেকে দূরে সরিয়ে দাও এবং আমাকেও তা থেকে ফিরিয়ে রাখো। আর যেখানেই কল্যাণ থাকুক না কেন, আমার জন্য সেই কল্যাণই নির্ধারিত করো, অতঃপর তাতেই আমাকে সন্তুষ্ট রাখো।
এই দোয়াটি অত্যন্ত বিশুদ্ধ সনদে সহীহ বুখারী, হাদিস ১১৬২-তে বর্ণিত হয়েছে।
ইস্তিখারা করার সঠিক পদ্ধতি ও নিয়মাবলি
ইস্তিখারা করার জন্য সুন্নাহসম্মত ধারাবাহিক পদ্ধতি নিচে তুলে ধরা হলো, যা অনুসরণ করলে আমলটি শরিয়ত অনুযায়ী সম্পন্ন হবে:
- পবিত্রতা ও ওজু: প্রথমে সাধারণ সালাতের মতোই সুন্দরভাবে ওজু সম্পন্ন করুন।
- দুই রাকাত নফল সালাত: নিষিদ্ধ বা মাকরুহ সময় ব্যতীত যেকোনো পবিত্র স্থানে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করুন। এই সালাতের বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট সূরা নেই; সূরা ফাতিহার পর কুরআন থেকে যেকোনো সূরা মিলিয়ে পড়া যাবে। তবে প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়ার বিশেষ কোনো বাধ্যবাধকতা বা সুন্নাহ নির্দেশিত নিয়ম নেই, যেকোনো সূরা পড়াই যথেষ্ট।
- সালাম ফিরানোর পর দুআ: সালাত শেষ করে সালাম ফিরানোর পর আল্লাহর প্রশংসা (হামদ) এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরূদ পাঠ করে উপরে উল্লেখিত ইস্তিখারার নির্দিষ্ট দুআটি অত্যন্ত মনোযোগ ও বিনয়ের সাথে পাঠ করুন।
- বিষয়টি উল্লেখ করা: দুআর মধ্যে 'হাযাল আমরা' (এই কাজটি) বলার সময় বা মনে মনে নিজের সুনির্দিষ্ট ইচ্ছা বা সিদ্ধান্তের কথা (যেমন: অমুক ব্যবসা বা অমুক বিয়ে) স্পষ্টভাবে আল্লাহর সামনে পেশ করুন।
ইস্তিখারা সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
আমাদের সমাজে ইস্তিখারা নিয়ে কিছু অমূলক ও ভিত্তিহীন ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যা সংশোধন করা জরুরি:
- স্বপ্ন দেখা আবশ্যক মনে করা: অনেকেই মনে করেন ইস্তিখারা করার পর রাতে স্বপ্নে সবুজ বা সাদা কিছু দেখা যাবে কিংবা কোনো সরাসরি নির্দেশনা পাওয়া যাবে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ইস্তিখারার মূল ফলাফল হলো, দুআ করার পর আল্লাহর তাওফিকে অন্তরের ঝোঁক বা প্রবণতা যেকোনো একদিকে তৈরি হওয়া এবং সেই কাজের উপায়গুলো সহজ হয়ে যাওয়া।
- শুধু বিয়ের জন্য নির্দিষ্ট করা: একটি সাধারণ ভুল ধারণা হলো ইস্তিখারা কেবল বিয়ের সিদ্ধান্তের জন্যই করা হয়। অথচ সুন্নাহ অনুযায়ী ছোট-বড় যেকোনো বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ বৈষয়িক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই ইস্তিখারা করা মুস্তাহাব।
- ফরজ বা ওয়াজিব কাজে ইস্তিখারা করা: যেসব কাজ শরিয়তে স্পষ্ট ফরজ, ওয়াজিব বা হারাম (যেমন: সালাত আদায় করা বা না করা, সুদ খাওয়া বা না খাওয়া) সেসব ক্ষেত্রে ইস্তিখারা করার কোনো সুযোগ নেই। ইস্তিখারা কেবল বৈধ ও মুবাহ কাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
References
Quranic Ayahs
ইস্তিখারার মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা, যা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে নির্দেশিত হয়েছে।
- সূরা আল-ইমরান, ৩:১৫৯ — সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আল্লাহর ওপর ভরসা করার নির্দেশ।
Hadith
- সহীহ বুখারী, হাদিস ১১৬২ (অধ্যায়: তহাজ্জুদ সালাত) — জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) কর্তৃক বর্ণিত ইস্তিখারার মূল সালাত ও দুআর বিবরণ।
- সুনানে তিরমিযী, হাদিস ২৯৬৯ — দুআ নিজেই একটি স্বতন্ত্র ইবাদত হওয়ার প্রামাণিক দলিল।

