ফরজ সালাত শুরুর ঠিক আগে মুয়াজ্জিন বা ইকামতদাতা জামাতের কাতার সোজা করার উদ্দেশ্যে যে বিশেষ আহ্বানধ্বনি উচ্চারণ করেন, তাকেই ইকামত বলা হয়। আযানের মতো ইকামতের বাক্যগুলো শুনে তার জবাব দেওয়া একটি অন্যতম মুস্তাহাব আমল। তবে ইকামতের জবাব দেওয়ার শব্দাবলি ও এর হাদিসগুলোর বিশুদ্ধতা নিয়ে সাধারণ মুসলিমদের মাঝে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। সুন্নাহর সঠিক অনুসরণের জন্য ইকামতের জবাব দেওয়ার খাঁটি পদ্ধতি এবং এই বিষয়ে ফকিহ ও মুহাদ্দিসগণের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ জানা অত্যন্ত জরুরি।
ইকামতের উত্তর দেওয়ার সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি
ইসলামি শরিয়তের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, আযানের মতো ইকামতের বাক্যগুলোও মুয়াজ্জিনের সাথে সাথে মনে মনে বা নিচু স্বরে পুনরাবৃত্তি করতে হয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু বাক্যের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে:
- মুয়াজ্জিন যখন ‘হাইয়া আলাস সালাহ’ এবং ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ বলবেন, তখন শ্রোতা বলবেন: ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া পাপ থেকে বাঁচার এবং পুণ্য কাজ করার কোনো সামর্থ্য নেই)।
- মুয়াজ্জিন যখন ‘কদ ক্বামাতিস সালাহ’ বলবেন, তখন শ্রোতাও উত্তর হিসেবে ‘কদ ক্বামাতিস সালাহ’ (সালাত প্রতিষ্ঠিত হলো) বলবেন। এটিই বিশুদ্ধতম মত।
হাদিসের আলোকে ইকামতের জবাবের দলিল ও সত্যতা
ইকামতের জবাব আযানের মতোই দেওয়ার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে আযানের বাক্যগুলোর জবাবে কী বলতে হবে তা বিস্তারিত এসেছে, যার শেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি এভাবে অন্তর থেকে জবাব দেবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এই মৌলিক বিধানটি সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৫) দ্বারা প্রমাণিত।
যেহেতু আল্লাহর রাসুল (সা.) অন্য একটি হাদিসে বলেছেন, “আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না”, এবং ফিকহি পরিভাষায় ইকামতকেও এক প্রকার আযান (দ্বিতীয় আযান) বলা হয়, তাই আযানের জবাবের নিয়মটি ইকামতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
তবে আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি বর্ণনা রয়েছে যে, মুয়াজ্জিন যখন ‘কদ ক্বামাতিস সালাহ’ বলেন, তখন জবাবে ‘আক্বামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা’ (আল্লাহ একে প্রতিষ্ঠিত রাখুন ও স্থায়িত্ব দিন) বলতে হবে। এই সংক্রান্ত বর্ণনাটি সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫২৮-এ এসেছে। কিন্তু ইমাম আবু দাউদ স্বয়ং এবং আধুনিক যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল-আলবানীসহ জুরহ ওয়া তাদিলের ইমামগণ এই হাদিসের সনদকে জইফ বা অত্যন্ত দুর্বল বলে সাব্যস্ত করেছেন। সুতরাং, দুর্বল হাদিসের ওপর আমল না করে মুয়াজ্জিনের সাথে মিল রেখে ‘কদ ক্বামাতিস সালাহ’ বলাই সুন্নাহসম্মত ও নিরাপদ।
মাজহাবগত দৃষ্টিকোণ ও ফিকহি মতামত
ইকামতের জবাব দেওয়ার শরয়ী গুরুত্ব এবং এর শব্দ চয়ন নিয়ে চার মাজহাবের ইমামগণের মধ্যে সুচিন্তিত বিশ্লেষণ রয়েছে, যা নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
হানাফি মাজহাব
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘ফাতাওয়া হিন্দিয়া’ ও ‘রদ্দুল মুহতার’ অনুযায়ী, ইকামতের শব্দগুলোর জবাব দেওয়া মুস্তাহাব। হানাফি আলেমদের একটি অংশ জইফ হাদিসটির ওপর ভিত্তি করে ‘কদ ক্বামাতিস সালাহ’-এর জবাবে ‘আক্বামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা’ বলা জায়েজ মনে করলেও, আধুনিক ফকিহগণ সুন্নাহর বিশুদ্ধতার স্বার্থে মূল বাক্যের পুনরাবৃত্তি করাকেই উত্তম বলেছেন।
শাফেয়ি মাজহাব
ইমাম নববী (রহ.)-এর ফতোয়া অনুযায়ী, আযানের মতো ইকামতের শব্দগুলোর হুবহু জবাব দেওয়া সুন্নাহ। শাফেয়ি মাজহাবেও ‘হাইয়া আলা...’ বাক্য দুটির জবাবে ‘লা হাওলা...’ পাঠ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
হাম্বলি ও মালিকি মাজহাব
ইমাম ইবনে কুদামা তাঁর ‘আল-মুগনি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, হাম্বলি মাজহাব মতে ইকামতের জবাব দেওয়া আযানের মতোই একটি বরকতময় আমল। মালিকি মাজহাবেও ইকামতের বাক্যগুলো শুনে চুপিসারে তার পুনরাবৃত্তি করাকে উত্তম ও সালাতের একাগ্রতা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়।
ইকামতের উত্তর দেওয়া কি ওয়াজিব?
জুমহুর বা অধিকাংশ শরিয়ত বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতে, ইকামতের উত্তর দেওয়া সুন্নাহ বা মুস্তাহাব; এটি কোনো ওয়াজিব বা ফরয বিধান নয়। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো কারণে ইকামতের জবাব না দেয়, তবে সে গুনাহগার হবে না। তবে জামাত শুরুর আগের এই পবিত্র মুহূর্তে দুনিয়াবি কথাবার্তা বা অন্য কোনো কাজে লিপ্ত না হয়ে ইকামতের প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং মনে মনে তার জবাব দেওয়া একজন আদর্শ মুসলিমের বৈশিষ্ট্য।
তথ্যসূত্র
কুরআন
- সূরা আল-আহজাব, ৩৩:২১ — ইবাদতের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণের নির্দেশ।
হাদিস
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৫ (অধ্যায়: সালাত) — আযানের বাক্যগুলোর জবাব দেওয়া এবং তার বিনিময়ে জান্নাত লাভের ঘোষণা।
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫২৮ (অধ্যায়: সালাত) — ইকামতের জবাব সংক্রান্ত জইফ (দুর্বল) সনদের হাদিস।
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২০৮ (অধ্যায়: সালাত) — আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের ফজিলত সংক্রান্ত আলোচনা।
ইকামতের সময় ‘কদ ক্বামাতিস সালাহ’ শুনলে জবাবে কী বলা উচিত?
বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, মুয়াজ্জিনের সাথে মিল রেখে ‘কদ ক্বামাতিস সালাহ’-ই বলা উচিত। প্রচলিত ‘আক্বামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা’ বলার হাদিসটি সনদের দিক থেকে জইফ (দুর্বল) হওয়ায় তা বর্জন করাই শ্রেয়।
সালাতের কাতার সোজা করার সময় কি ইকামতের জবাব দেওয়া যায়?
হ্যাঁ, কাতার সোজা করার পাশাপাশি মুখে বা মনে মনে নিচু স্বরে ইকামতের বাক্যগুলোর জবাব দেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি সুন্নাহসম্মত আমল।
নারীরা কি ঘরে সালাত আদায়ের সময় ইকামতের জবাব দেবেন?
হ্যাঁ, নারীরা যখন নিজেদের ঘরে সালাত আদায়ের প্রস্তুতি নেবেন কিংবা নিকটবর্তী মসজিদ থেকে ইকামতের আওয়াজ শুনতে পাবেন, তখন তাদের জন্যও পুরুষদের মতোই নিচু স্বরে ইকামতের জবাব দেওয়া মুস্তাহাব।
ইকামত শেষ হওয়ার পর বিশেষ কোনো মোনাজাত বা হাত তুলে দোয়া আছে কি?
না, ইকামত শেষ হওয়ার পর হাত তুলে সম্মিলিত বা ব্যক্তিগত কোনো বিশেষ মোনাজাতের প্রমাণ রাসুলুল্লাহ (সা.) কিংবা সাহাবায়ে কেরাম থেকে পাওয়া যায় না। ইকামত শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ইমাম তাকবিরে তাহরিমা বলে সালাত শুরু করবেন।

