ইসলামের অন্যতম প্রধান এবং প্রকাশ্য একটি শিআর বা নিদর্শন হলো আযান। দৈনিক পাঁচবার আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালাতের এক সুউচ্চ ঘোষণা ভেসে আসে মসজিদের মিনার থেকে। মুআযযিন যখন সালাতের এই মহান আহ্বান প্রচার করেন, তখন শ্রোতাদের জন্য মনোযোগ দিয়ে তা শোনা এবং সুন্নতি পদ্ধতিতে তার উত্তর দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে আযানের প্রতিটি বাক্যের নির্দিষ্ট জবাব শিক্ষা দিয়েছেন, যা বান্দার ঈমানকে নবায়ন করে এবং আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যম হয়। আমাদের সমাজে আযানের জবাব দেওয়ার আমলটি প্রচলিত থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে সঠিক শব্দ উচ্চারণ এবং পূর্ণাঙ্গ সুন্নতি নিয়ম পালনে অসচেতনতা দেখা যায়। এই নিবন্ধে আযানের প্রতিটি লাইনের বিশুদ্ধ জবাব, আরবী, উচ্চারণ, অর্থ এবং হাদিসের আলোকে এর নিয়মাবলি বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
আযানের জবাব দেওয়ার গুরুত্ব ও ফজিলত
মুআযযিনের আযানের ধ্বনি শোনার পর তার জবাব দেওয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জোরালো সুন্নাহ। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আযানের বাক্যগুলোর জবাব দেওয়ার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়ে এরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি মুআযযিনের আযানের জবাবে অন্তর থেকে এই বাক্যগুলো বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৫)
আযানের জবাব দেওয়া কেবল একটি বাচনিক আমলই নয়, এটি হৃদয় দিয়ে আল্লাহর বড়ত্ব ও সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করার এক অনন্য মাধ্যম। মুআযযিন যখন দ্বীনের শ্রেষ্ঠ আমল সালাতের দিকে ডাকেন, তখন বান্দা তার নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে আল্লাহর দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করে।
আযানের প্রতিটি বাক্যের সুন্নতি জবাব (লাইন বাই লাইন)
আযান শোনার সময় সাধারণ নিয়ম হলো, মুআযযিন যা বলবেন, শ্রোতাও হুবহু তা-ই পুনরাবৃত্তি করবেন। তবে এর ব্যতিক্রম কেবল ‘হাইয়া আলাস সালাহ’ এবং ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ বাক্য দুটির ক্ষেত্রে। নিচে আযানের প্রতিটি লাইনের বিস্তারিত জবাব আরবী ও অর্থসহ দেওয়া হলো:
১. আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার (আল্লাহ সবচেয়ে মহান)
জবাব: মুআযযিনের মতো হুবহু ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’ বলতে হবে।
২. আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই)
জবাব: হুবহু ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে হবে।
৩. আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল)
জবাব: হুবহু ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বলতে হবে।
৪. হাইয়া আলাস সালাহ (নামাজের দিকে এসো)
জবাব: এখানে হুবহু পুনরাবৃত্তি না করে বলতে হবে: ‘লা হাওলা ওয়া লা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ’ (লিল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই)।
৫. হাইয়া আলাল ফালাহ (কল্যাণ ও সফলতার দিকে এসো)
জবাব: পূর্বের ন্যায় এটি শুনেও বলতে হবে: ‘লা হাওলা ওয়া লা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ’।
৬. আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার (আল্লাহ সবচেয়ে মহান)
জবাব: মুআযযিনের মতো হুবহু ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’ বলতে হবে।
৭. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই)
জবাব: হুবহু ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে হবে।
ফজরের আযানের বিশেষ বাক্যের জবাব
ফজরের আযানের সময় মুআযযিন ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’-এর পর অতিরিক্ত একটি বাক্য দুইবার পাঠ করেন, যা হলো: ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’ (ঘুম হতে নামাজ উত্তম)। ফিকহবিদদের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী, ফজরের আযানের এই বিশেষ অংশটি শোনার পরও হুবহু ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’-ই বলতে হবে। কোনো কোনো বর্ণনায় ‘সাদাক্বতা ওয়া বারারতা’ বলার কথা পাওয়া গেলেও মুহাদ্দিসগণের তাহকীক অনুযায়ী সেই বর্ণনাটি হাদিসশাস্ত্রে প্রমাণিত বা সহিহ নয়।
আযান শেষ হওয়ার পর করণীয় আমলসমূহ
আযানের শব্দগত জবাব দেওয়া শেষ হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমলের তাগিদ দিয়েছেন, যা ধারাবাহিকভাবে পালন করা সুন্নত:
- দুরুদ শরীফ পাঠ করা: আযান শেষ হওয়ার পর প্রথমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দুরুদ (দুরুদে ইব্রাহীম পড়া সর্বোত্তম) পাঠ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যখন তোমরা মুআযযিনের আযান শুনবে... অতঃপর আমার ওপর দুরুদ পাঠ করবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৪)
- আযানের মাসনুন দুআ পাঠ করা: দুরুদ পাঠের পর সহীহ বুখারীতে বর্ণিত উসিলা ও মাকামে মাহমুদের প্রসিদ্ধ দুআটি পাঠ করতে হবে:
‘আল্লাহুম্মা রব্বা হাযিহিদ দা‘ওয়াতিত তাম্মাহ, ওয়াস সালাতিল ক্বা-ইমাহ, আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাদীলাহ, ওয়াব‘আসহু মাক্বামাম মাহমুদানিল্লাযী ওয়া‘আত্তাহ।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস ৬১৪)
আযানের জবাব দেওয়ার আদব ও কিছু সাধারণ ভুল
সুন্নাহর পূর্ণ সওয়াব অর্জনের জন্য আযান শোনার সময় কিছু আদব বজায় রাখা এবং প্রচলিত ভুলসমূহ বর্জন করা জরুরি:
- কথাবার্তা বন্ধ রাখা: আযান শুরু হলে পারস্পরিক সাধারণ কথাবার্তা, গল্পগুজব বা জাগতিক কাজকর্ম বন্ধ করে মনোযোগ দিয়ে আযান শোনা এবং তার জবাব দেওয়া উচিত।
- মুআযযিনের সাথে সাথে না বলা: মুআযযিন একটি বাক্য সম্পূর্ণ শেষ করার পর শ্রোতা সেই বাক্যের জবাব দেবেন। মুআযযিনের সাথে সাথে বা তার আগে আগে বাক্য উচ্চারণ করা সুন্নাহ পরিপন্থী।
- হাত তোলার প্রচলিত ভুল: আযানের জবাব দেওয়ার সময় বা ‘আল্লাহুম্মা রব্বা...’ দুআটি পড়ার সময় হাত তোলার কোনো সুন্নতি প্রমাণ নেই। তবে এই নির্দিষ্ট দুআটি পাঠ করা শেষ হলে, আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে হাত তুলে নিজের জন্য আল্লাহর কাছে যেকোনো বৈধ দুআ করা যাবে, কারণ এটি দুআ কবুলের বিশেষ সময়।
উপসংহার
আযানের জবাব দেওয়া একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত বরকতময় আমল। প্রতিদিন পাঁচবার আযানের মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমাদের তাঁর ঘরের দিকে আহ্বান করেন। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সঠিক নিয়মে আযানের জবাব ও দুআ পাঠ করার মাধ্যমে আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহান সুপারিশ বা শাফাআত লাভ করতে পারি। প্রতিটি মুসলিমের উচিত এই সহজ সুন্নাহটি নিয়মিত আমল করা।
References
Quranic Ayahs
- সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৬ — রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দুরুদ পাঠের নির্দেশ।
Hadith
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৬১৪ (অধ্যায়: আযান) — আযানের পর মাসনুন দুআ পাঠ এবং শাফাআত ওয়াজিব হওয়ার সহিহ দলিল।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৪ (অধ্যায়: সালাত) — আযান শোনার পর মুআযযিনের অনুরূপ বলা এবং দুরুদ পাঠের নির্দেশ।
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৫ (অধ্যায়: সালাত) — আযানের জবাব দেওয়ার মাধ্যমে জান্নাত লাভের সুসংবাদ।
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫২৪ (অধ্যায়: সালাত) — আযানের জবাবের শব্দবিন্যাস ও ফজিলত।

