বিতর সালাত হলো রাতের শেষভাগে আদায়কৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। এই সালাতের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও সুন্নাহসম্মত আমল হলো ‘দুআ কুনুত’ পাঠ করা। কুনুত শব্দের অর্থ হলো বশ্যতা স্বীকার করা, আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে দাঁড়ানো এবং প্রার্থনা করা। বিতরের সালাতে এই দুআ পাঠের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, ক্ষমা, হেদায়েত এবং রহমতের প্রতি নিজের পরম মুখাপেক্ষীতা প্রকাশ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম বিতরের সালাতে নিয়মিত কুনুত পাঠ করতেন। তবে আমাদের সমাজে প্রচলিত দুআ কুনুতের শব্দবিন্যাস এবং এর সঠিক প্রয়োগ নিয়ে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। এই নিবন্ধে সহিহ হাদিসের আলোকে বিতরের দুআ কুনুত, এর বিশুদ্ধ আরবি, বাংলা অর্থ এবং আমল করার সঠিক নিয়মাবলী বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
দুআ কুনুতের প্রকারভেদ ও হাদিসের বিশুদ্ধ পাঠ
বিতরের সালাতে প্রধানত দুই ধরনের দুআ কুনুত পাঠের বিবরণ পাওয়া যায়। একটি হলো হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে আল্লাহর রাসুল (সা.) নিজে যে দুআটি শিখিয়েছিলেন (اللَّهُمَّ اهْدِنِي), যা সুনান গ্রন্থসমূহে সহিহ সনদে বর্ণিত। অপরটি হলো হযরত উমর (রা.) ও ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ দুআ কুনুত (اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ), যা হানাফি মাজহাবে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ও পঠিত।
১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সহিহ দুআ কুনুত (জমহুর ওলামাদের মতে উত্তম)
হযরত হাসান ইবনে আলী (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বিতরের সালাতে কুনুত হিসেবে পড়ার জন্য কিছু বাক্য শিখিয়েছেন। তা হলো:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাহদিনী ফীমান হাদাইত, ওয়া আফিনী ফীমান আফাইত, ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লাইত, ওয়া বারিক লী ফীমা আতাইত, ওয়া কিনী শাররা মা কাজাইত; ফাইন্নাকা তাকযী ওয়ালা ইয়ুকযী আলাইক; ওয়া ইন্ন্নাহু লা ইয়াযিল্লু মাঁও ওয়ালাইত, ওয়ালা ইয়াউইযযু মান আদাইত; তাবারাকতা রাব্বানা ওয়া তাআলাইত।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আপনি যাদের হেদায়েত করেছেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যাদের আফিয়াত (নিরাপত্তা) দিয়েছেন আমাকে তাদের মধ্যে শামিল করুন, যাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন আমারও তাদের মধ্যে অভিভাবকত্ব করুন। আপনি আমাকে যা দান করেছেন তাতে বরকত দিন এবং আপনার ফয়সালাকৃত মন্দের অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করুন। নিশ্চয়ই আপনি ফয়সালা করেন, আপনার বিরুদ্ধে কোনো ফয়সালা করা হয় না। নিশ্চয়ই আপনি যার সাথে বন্ধুত্ব রাখেন সে কোনোদিন অপমানিত হয় না, আর আপনি যার সাথে শত্রুতা করেন সে কোনোদিন সম্মানিত হতে পারে না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি বরকতময় এবং সর্বোচ্চ সুমহান।
এই দুআটি সুনান গ্রন্থসমূহে অত্যন্ত বিশুদ্ধ সনদে এসেছে এবং ইমাম তিরমিযী একে ‘হাসান সহিহ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। (বিস্তারিত দেখুন: জামিউত তিরমিযী,自动 হাদিস ৪৬৪)।
২. উমর ও ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধ দুআ কুনুত (হানাফি মাজহাবে প্রচলিত)
হানাফি মাজহাবের ফকিহগণ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং উমর (রা.)-এর আমল অনুসরণ করে বিতরের নামাযে নিম্নোক্ত দুআ কুনুত পাঠ করাকে বেশি অগ্রাধিকার দেন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তাঈনুকা ওয়া নাস্তাগফিরুকা ওয়া নু’মিনু বিকা ওয়া নাতাওয়াক্কালু ‘আলাইকা ওয়া নুছনী ‘আলাইকাল খাইরা কুল্লাহু; নাশকুরুকা ওয়া লা নাকফুরুকা ওয়া নাখলাউ ওয়া নাতরুকু মাইঁ ইয়াফজুরুকা। আল্লাহুম্মা ইইয়্যাকা নাবুদু ওয়া লাকা নুসল্লী ওয়া নাসজুদু ওয়া ইলাইকা নাসআ ওয়া নাহফিদু; নারজু রাহমাতাকা ওয়া নাখশা আজাবাকা, ইন্না আজাবাকা বিল কুফফারি মুলহিক্ব।
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমরা আপনারই সাহায্য চাই এবং আপনারই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আপনার ওপর ঈমান রাখি, আপনার ওপর ভরসা করি এবং আপনার সব ধরনের উত্তম প্রশংসা করি। আমরা আপনার কৃতজ্ঞতা আদায় করি, আপনার প্রতি অকৃতজ্ঞ হই না। যারা আপনার নাফরমানি করে, আমরা তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি ও পরিত্যাগ করি। হে আল্লাহ! আমরা আপনারই ইবাদত করি, আপনার জন্যই নামায পড়ি ও সেজদা করি এবং আপনার দিকেই ধাবিত হই ও আপনার আনুগত্যে সদা প্রস্তুত থাকি। আমরা আপনার রহমতের আশা করি এবং আপনার শাস্তিকে ভয় করি; নিশ্চয়ই আপনার শাস্তি কাফেরদের গ্রাস করবে।
এই দুআটি সাহাবায়ে কেরামের আমল হিসেবে সুনানে বায়হাক্বীসহ বিভিন্ন গ্রন্থে সহিহ সূত্রে প্রমাণিত। নামাযের কুনুতে এই দুটি দুআর যেকোনো একটি অথবা উভয়টি মিলিয়ে পড়া সম্পূর্ণ জায়েজ।
সালাতে দুআ কুনুত পাঠের সুন্নাত নিয়ম ও সময়
বিতরের সালাতে দুআ কুনুত কখন এবং কীভাবে পড়তে হবে, এ বিষয়ে ফকিহগণের মধ্যে দুটি প্রধান মত রয়েছে এবং উভয়টিই সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত:
- ১. রুকুর পূর্বে (হানাফি মাজহাবের নিয়ম): হানাফি ফিকহের বিধান অনুযায়ী, বিতরের তৃতীয় রাকাতে সূরা ফাতেহার পর অন্য কোনো সূরা বা কিরাত শেষ করে রুকুতে যাওয়ার আগে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে পুনরায় কান বা কাঁধ বরাবর হাত তুলে তাকবীর বলতে হয়। এরপর আবার হাত বেঁধে সম্পূর্ণ নীরবে দুআ কুনুত পাঠ করতে হয়। দুআ শেষে সাধারণ নিয়মেই রুকু ও সেজদা আদায় করতে হয়।
- ২. রুকুর পরে (শাফেয়ী, হাম্বলি ও আহলে হাদিসগণের নিয়ম): দ্বিতীয় মতানুযায়ী, কিরাত শেষ করে স্বাভাবিকভাবে রুকু আদায় করতে হবে। রুকু থেকে উঠে ‘রাব্বানা লাকাল হামদ’ বলার পর হাত বুক বরাবর তুলে সম্মিলিত বা একাকী অবস্থায় উচ্চস্বরে বা নীরবে দুআ কুনুত পাঠ করা হয় এবং দুআ শেষে হাত না মুছে সরাসরি সেজদায় চলে যেতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ফিতনা বা বিপদের সময় ফরয নামাযেও রুকুর পরে কুনুতে নাযেলা পড়েছেন। (তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারী, হাদিস ১০০১)।
দুআ কুনুত পাঠের ক্ষেত্রে সাধারণ কিছু ভুলত্রুটি ও সংস্কার
আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু অভ্যাস সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে তৈরি হয়েছে, যা সংশোধন করা দরকার:
- দাবীর অসারতা: ইনপুট টেক্সটে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, রাসুল (সা.) বলেছেন, “বিতরের নামাযে দুআ কুনুত পড়লে কিয়ামতের দিন শাফায়াত পাবে”—এই তথ্যটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং হাদীসশাস্ত্রের কোথাও এর কোনো অস্তিত্ব নেই। রাসুল (সা.)-এর নামে এমন কোনো মনগড়া জাল কথা ছড়ানো থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। কুনুতের ফজিলত হলো এটি সুন্নাত এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য মাধ্যম।
- হাত দিয়ে মুখ মোছা: রুকুর পরে হাত তুলে দুআ কুনুত শেষ করার পর অনেকে সেজদায় যাওয়ার আগে হাত দিয়ে মুখ মুছে থাকেন। নামাযের ভেতরে দুআ শেষে হাত দিয়ে মুখ মোছার কোনো সহিহ ভিত্তি হাদিসে নেই; বরং দুআ শেষ করে হাত না মুছে সরাসরি সেজদায় চলে যাওয়াই সুন্নাতসম্মত।
- আরবি উচ্চারণের বিকৃতি: দুআ কুনুতের শব্দগুলো আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী সঠিকভাবে উচ্চারণ করা ওয়াজিব। ভুল উচ্চারণের কারণে যদি অর্থ সম্পূর্ণ বদলে যায় (যেমন 'নাহফিদু' এর জায়গায় 'নাহফিজু' পড়া), তবে নামাযের মারাত্মক ত্রুটি হয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. দুআ কুনুত মুখস্থ না থাকলে নামাযে কী পড়া যাবে?
২. বিতর নামাযে দুআ কুনুত পড়তে ভুলে গেলে করণীয় কী?
৩. দুআ কুনুত কি শুধু রমজান মাসেই পড়তে হয়?
রেফারেন্সসমূহ
কুরআনীয় আয়াতসমূহ
- সূরা আল-বাকারাহ, ২:২০১ — ইহকাল ও পরকালের সামগ্রিক কল্যাণ প্রার্থনার সর্বশ্রেষ্ঠ কুরআনীয় দুআ (বিকল্প হিসেবে পঠিতব্য)।
হাদিস শরীফ
- জামিউত তিরমিযী, হাদিস ৪৬৪ (অধ্যায়: সালাত) — রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক হযরত হাসান (রা.)-কে কুনুতের সুনির্দিষ্ট দুআ শিক্ষার সহিহ বিবরণ।
- সহিহ বুখারী, হাদিস ১০০১ (অধ্যায়: বিতর) — রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক রুকুর পরে কুনুত (কুনুতে নাযেলা) পাঠের বিবরণ।
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৭০ (অধ্যায়: কাসরুস সালাত) — রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাতের সালাত ও বিতরের সাধারণ আমল সংক্রান্ত আলোচনা (Plain Text)।
- সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৪২৫ (অধ্যায়: সালাত) — বিতর সালাতে কুনুত পাঠের সাধারণ সুন্নাত ও তার শব্দবিন্যাস।

