কথোপকথনের বৈধাবৈধ
কোন সম্মানিত ব্যক্তিকে বা শূণ্ডরকে ‘আব্বা’ বলে সম্বোধন করা বৈধ কি?
০ বার পড়া হয়েছে৫ মিনিটে পড়ুন
উত্তরদাতা আলেম
কোন সম্মানিত ব্যক্তিকে বা শূণ্ডরকে ‘আব্বা’ বলে সম্বোধন করায় কোন দোষ নেই। যেমন দোষ নেই নিজের ছেলে ছাড়া অন্য কোন স্নেহভাজনকে ‘বেটা’ বলে সম্বোধন করা। এ সম্বোধনে উদ্দেশ্য থাকে পিতার মতো শ্রদ্ধা এবং পুত্রের মতো স্নেহ প্রকাশ। পিতৃত্বল্যকে ‘পিতা’ বলা এবং পুত্রত্বল্যকে ‘বেটা’ বলা, তদনুরূপ মাতৃত্বল্যকে ‘মাতা’ বা ‘মা’ বলা এবং কন্যাত্বল্যকে ‘বেটি’ বলায় কোন বংশীয় সম্বন্ধ উদ্দিষ্ট থাকে না। আলকুরআনে জন্মদাত্রী মা ছাড়া অন্য মহিলাকে ‘মা’ বলার কথা এসেছে। মহানবী ﷺ-এর স্ত্রীদেরকে মু’মিনদের মা বলা হয়েছে। {النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ} (৬) سورة الأحزاب অর্থাৎ, নবী, বিশ্বাসীদের নিকট তাদের প্রাণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয় এবং তার স্ত্রীগণ তাদের মা। (আহযাব : ৬) {فَلَمَّا دَخَلُوا عَلَىٰ يُوسُفَ آوَىٰ إِلَيْهِ أَبْوَيْهِ وَقَالَ ادْخُلُوا مِصْرَ إِن شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ} (৯৯) অর্থাৎ, অতঃপর তারা যখন ইউসুফের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দান করল এবং বলল, ‘আপনারা আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন।’ (ইউসুফ : ৯৯) {وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ} (১০০) سورة يوسف অর্থাৎ, ইউসুফ তার পিতা-মাতাকে সিংহাসনে বসাল। (ইউসুফ : ১০০) উক্ত আয়াতে ইউসুফ ﷺ-এর ‘পিতামাতা’ বলে তাঁর পিতা ও খালাকে বুঝানো হয়েছে। কারণ তাঁর মায়ের ইন্তিকাল পূর্বেই হয়ে গিয়েছিল। নিজ জন্মদাতা পিতা ছাড়া অন্যকে পিতা বলার কথাও এসেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, {أَمْ كُنْتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِنْ بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَهَكَ وَإِلَهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَهًا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ} (১৩৩) البقرة অর্থাৎ, ইয়াকুবের নিকট যখন মৃত্যু এসেছিল তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে? সে যখন নিজ পুত্রগণকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমার (মৃত্যুর) পরে তোমরা কিসের উপাসনা করবে?’ তারা তখন বলেছিল, ‘আমরা আপনার উপাস্য ও আপনার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম, ইসমাইল ও ইসহাকের উপাস্য, সেই অদ্বিতীয় উপাস্যের উপাসনা করব। আর আমরা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণকারী।’ (বাক্বারাহ : ১৩৩) এখানে পিতৃব্য, পিতামহ-প্রপিতামহকেও ‘পিতা’ বলেই আখ্যায়ন করা হয়েছে। আর বিদিত যে, ইসমাইল ﷺ ইয়াকুব ﷺ-এর চাচা ছিলেন। {وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَبْلُ وَفِي هَذَا لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَاعْتَصِمُوا بِاللَّهِ هُوَ مَوْلَاكُمْ فَنِعْمَ الْمَوْلَىٰ وَنِعْمَ النَّصِيرُ} অর্থাৎ, সংগ্রাম কর আল্লাহর পথে যেভাবে সংগ্রাম করা উচিত; তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠিনতা আরোপ করেননি; এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের মিল্লাত (ধর্মদর্শন); তিনি পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’ এবং এই গ্রন্থেও; যাতে রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং তোমরা সাক্ষী স্বরূপ হও মানব জাতির জন্য। সুতরাং তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং আল্লাহকে অবলম্বন কর; তিনিই তোমাদের অভিভাবক, কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী তিনি! (হাজ্জ : ৭৮) এখানে ইব্রাহীম ﷺ-কে মুসলিমদের ‘পিতা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যেহেতু তিনি উম্মাহর নিকট পিতৃত্বল্য। যেমন আমাদের নবী ﷺও বলেছেন, {إِنَّمَا أَنَا لَكُمْ بِمَنْزِلَةِ الْوَالِدِ ، أَعْلَمُكُمْ ، ..} অর্থাৎ, আমি তো তোমাদের পিতৃত্বল্য, তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়ে থাকি....। (আবু দাউদ) সুতরাং তিনি আমাদের পিতৃত্বল্য। তবে তিনি কারো ‘পিতা’ নন, অর্থাৎ জনক নন। মহান আল্লাহ বলেছেন, {مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ} (৪০) الأحزاب অর্থাৎ, মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নয়, বরং সে আল্লাহর রসূল ও শেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। (আহযাব : ৪০) যেমন তাঁর স্ত্রীগণ আমাদের জননী না হয়েও ‘আমাদের মাতা’। অনুরূপ তিনি আমাদের জনক না হয়েও সম্মানে ‘পিতা’। কোন কোন ক্বিরাআতে এসেছে, {النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ وَهُوَ أَبٌ لَهُمْ} (৬) سورة الأحزاب অর্থাৎ, নবী, বিশ্বাসীদের নিকট তাদের প্রাণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয় এবং তার স্ত্রীগণ তাদের মাতা-স্বরূপ। আর সে তাদের পিতা-স্বরূপ। (আহযাব : ৬, ইবনে কাযীর ৬/৩৮১, ফাতহুল ক্বাদীর ৪/৩৭২) আনাস রাঃ কতক বর্ণিত, তাঁকে মহানবী সঃ ‘বোটা’ বলে সম্বোধন করতেন। (মুসলিম ২১৫১নং) বরং ইমাম নাওয়াবী স্নেহাস্পদদেরকে ‘বোটা’ বলে সম্বোধন করা মুস্তাহাব বলেছেন। মোট কথা, পরস্পর সম্বোধনে এই শ্রেণীর শ্রদ্ধা ও স্নেহসূচক শব্দ ব্যবহার করায় কোন দোষ নেই। পক্ষান্তরে হাদীসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সঃ বলেছেন, “সবচেয়ে বড় মিথ্যারোপ হল সেই ব্যক্তির কাজ, যে পরের বাপকে নিজ বাপ বলে দাবি করে অথবা তার চক্ষুকে তা দেখায়, যা সে (বাস্তবে) দেখেনি। (অর্থাৎ, স্বপ্ন দেখার মিথ্যা দাবি করে।) অথবা আল্লাহর রসূল সঃ যা বলেননি, তা তাঁর প্রতি মিথ্যাভাবে আরোপ করে।” (বুখারী) “যে ব্যক্তি পরের বাপকে নিজের বাপ বলে, অথচ সে জানে যে, সে তার বাপ নয়, সে ব্যক্তির জন্য জালাত হারাম।” (বুখারী ৬৭৬৬, ৬৭৬৭, মুসলিম ৬৩নং, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ) “যে ব্যক্তি পরের বাপকে নিজের বাপ বলে দাবী করে, সে ব্যক্তি জালাতের সুগন্ধিও পাবে না। অথচ তার সুগন্ধি ৫০০ বছরের দূরবর্তী স্থান থেকেও পাওয়া যাবে।” (আহমাদ ২/১৭১, ইবনে মাজাহ ২৬১১, সহীহুল জামে’ ৫৯৮৮নং) “যে ব্যক্তি পরের বাপকে নিজের বাপ বলে দাবী করে অথবা তার (স্বাধীনকারী) প্রভু ছাড়া অন্য প্রভুর প্রতি সম্বন্ধ জুড়ে, সে ব্যক্তির উপর কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর অবিরাম অভিশাপ।” (আবু দাউদ, সহীহুল জামে’ ৫৯৮৭নং) এ সবার অর্থ সম্বোধনে ‘বাপ’ বলা নয়। এ সবার অর্থ হল, নিজের বাপকে অস্বীকার করা এবং কোন স্বার্থে অন্য কোন পুরুষকে নিজের ‘বাপ’ বলে দাবী করা। নিজের বংশকে অস্বীকার ক’রে অন্য বংশের সূত্র জুড়ে নেওয়া। এই জন্য হাদীসে এসেছে, নবী সঃ বলেছেন, “অজ্ঞাত বংশের সম্বন্ধ দাবী করা অথবা ছোট বা নীচু হলে তা অস্বীকার করা মানুষের জন্য কুফরী।” (আহমাদ প্রমুখ, সহীহুল জামে’ ৪৪৮৬নং)